২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কেন নিষ্ক্রিয় ছিল সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশন? শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা নিয়ে এনায়েত কবিরের বিস্ফোরক বিশ্লেষণ।
এনায়েত কবির | Northwest news এ প্রকাশিত; ১২ এপ্রিল, ২০২৬ঃ পর্ব-২:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক যুগান্তকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত হলেও, এর নেপথ্য ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘ ২০ মাস পর চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে, ৪ আগস্ট রাতে সাভারের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘৯ম পদাতিক ডিভিশন’-এর নিষ্ক্রিয়তা এবং সেনাসদর দপ্তরের রহস্যময় ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক সময়ের ক্ষমতাধর শেখ হাসিনা সরকারের পতন কি কেবল ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ছিল, না কি এর আড়ালে ছিল সুসংগঠিত সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ছক—তা নিয়ে জনমনে দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক।
৯ম পদাতিক ডিভিশনের পক্ষাঘাত: জিওসি-কে কেন ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখা হলো?
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ৯ম পদাতিক ডিভিশন একটি ‘স্ট্রাইক ফোর্স’ হিসেবে পরিচিত। ৪ আগস্ট যখন কোটা আন্দোলন সশস্ত্র দাঙ্গার রূপ নিচ্ছিল, তখন এই ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল মঈন খানকে কেন সক্রিয় করা হয়নি?
তদন্তে জানা যায়, সেনাসদর দপ্তর থেকে তাকে ‘স্ট্যান্ডবাই’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, সৈন্যবাহিনী ঢাকার দিকে অগ্রসর হলে তা ‘ক্ষমতা দখলের চেষ্টা’ হিসেবে ভুল বার্তা দেবে। ফলে রাজধানী ঢাকা যখন কার্যত অরক্ষিত, তখন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সাভারে বসে ছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ছিল শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত কৌশল।
প্রোপাগান্ডা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: ‘হল গণহত্যা’র রহস্য
৫ আগস্টের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুসংগঠিতভাবে কিছু বয়ান প্রচার করা হয়েছিল।
দাবদাহের মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে—বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ‘গণহত্যা’ চালানো হয়েছে এবং নারী শিক্ষার্থীদের শ্লীলতাহানি করা হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।
ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের তথ্য বলছে, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী সশস্ত্র সহিংসতায় সরাসরি নিহত হননি।
তাহলে নিহতরা কারা ছিলেন? প্রায় ২০০ লাশের ময়নাতদন্ত বলছে, নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন দিনমজুর বা অ-ছাত্র এবং প্রায় সবারই মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এটি নির্দেশ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করতে অজ্ঞাত আততায়ীদের মাধ্যমে ‘টার্গেটেড কিলিং’ করা হয়েছিল, যার দায় সুকৌশলে পুলিশ ও তৎকালীন সরকারের ওপর চাপানো হয়।
হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও অজ্ঞাত বন্দুকধারী
মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় আর্মি এভিয়েশনের হেলিকপ্টার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার নেপথ্যেও ছিল রহস্য। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, লুঙ্গি পরা কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি হেলিকপ্টার থেকে ভবনের ছাদে নামছে। যদিও আইএসপিআর থেকে কেবল পানি ছিটানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ওই অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় আজও উন্মোচিত হয়নি। পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে এবং জনরোষ তুঙ্গে নিতে এই ধরণের ‘থার্ড পার্টি’ বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল।
এসএসএফ-এর অস্ত্রাগার ও সেনানিবাসের ভাষণ
৫ আগস্ট সকালে যখন ৪৬তম ব্রিগেডের কমান্ডারকে গণভবনের চেয়ে সেনানিবাসের নিরাপত্তায় জোর দিতে বলা হয়, তখনই শেখ হাসিনার পতনের ঘণ্টা বেজে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রীয় অতি-গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনী এসএসএফ (SSF) সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।
তারা তাদের অস্ত্রাগারে অস্ত্র রেখে সংসদ ভবনে আশ্রয় নিলেও সেনাবাহিনী তাদের নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে আসেনি।
একই সময়ে সেনাপ্রধানের ভাষণের সময় বারবার পরিবর্তন করাও ছিল উত্তেজনার পারদ চড়ানোর এক বিশেষ কৌশল।
সশস্ত্র বিদ্রোহ ও হদিসহীন অস্ত্রভাণ্ডার
ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত আসিফ মাহমুদ পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে, তারা সরকার উৎখাতে ‘সুদ্ধ বিদ্রোহের’ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার কোথায় ছিল? কারা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল?
২০ মাস পেরিয়ে গেলেও ডিজিএফআই বা এনএসআই-এর মতো সংস্থাগুলো এই সশস্ত্র প্রস্তুতির বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি।
এমনকি পুলিশ হত্যার সাথে জড়িতদের ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা একটি সুস্থ শাসনব্যবস্থায় বিরল।
অদৃশ্য ছায়ার রাজত্ব
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পেছনে একটি সর্বগ্রাসী ছায়া সক্রিয় ছিল, যা কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আজ স্বীকার করতে রাজি নয়।
অথচ সেই ছায়াই ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজনৈতিক শক্তি—সবাই এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হোতাদের আড়াল করে চলেছে।
ইতিহাসের এই অসমাপ্ত অধ্যায়টি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জননিরাপত্তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বলি হয়েছিল।
(চলবে…)
