২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ব্যবহৃত নিষিদ্ধ ৭.৬২ মিমি বুলেটের উৎস সন্ধানে বিস্ফোরক তথ্য। বরখাস্তকৃত সেনা কর্মকর্তা ও বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গোপন আঁতাত।
এনায়েত কবির | Northwest news এ প্রকাশিত; ১৪ এপ্রিল, ২০২৬: পর্ব-৩
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সাধারণ মানুষের রক্তে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, নিহতদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে সুনির্দিষ্ট ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের বুলেটে, যা সাধারণত পেশাদার স্নাইপার রাইফেলে ব্যবহৃত হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই নিষিদ্ধ বোরের গোলাবারুদ আন্দোলনকারীদের হাতে বা রাজপথে এলো কীভাবে? দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কিছু কর্মকর্তা, গোলন্দাজ (Artillery) ডিভিশনের অসাধু অংশ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর এক ভয়াবহ ত্রিমুখী আঁতাতের চিত্র।
আদালত কক্ষের অসভ্যতা: বিচারালয়ে যখন হুমকির মহড়া
ঘটনার সূত্রপাত ২৩ নভেম্বর ২০২৫।
ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম রক্ষণপক্ষের নারী আইনজীবী নাজনীন নাহারকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করেন।বিস্ময়কর বিষয় হলো, আদালত কক্ষের ভেতরেই সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান নাজনীন নাহারকে “তোকে ছিঁড়ে ফেলব” বলে সরাসরি হুমকি দেন। বিচারকদের সামনে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন শিষ্টাচার বহির্ভূত ঘটনাটি গণমাধ্যমে সেভাবে আসেনি, কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান আইনি কাঠামোতে উগ্রপন্থী ও বরখাস্ত কর্মকর্তাদের প্রভাব কতটুকু গভীর।
কে এই হাসিনুর রহমান? বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জঙ্গিবাদের কারিগর
বরখাস্তকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের অতীত রেকর্ড অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সামরিক আদালতের গোপন নথি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘উলফা’ (আসাম) এবং ‘এনএসসিএন’ (নাগাল্যান্ড)-এর সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ রয়েছে।
কেবল তাই নয়, বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ’ ও ‘হিযবুত তাহরীর’-এর প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।
২০১২ সালের ১৫ মার্চ এক কোর্ট মার্শালের রায়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগে হাসিনুরকে বরখাস্ত করে ৪ বছর ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তার সহযোগী আফজালুল হক ও মহসিনুল করিমও সমজাতীয় অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত হন।
মহসিনুল করিমের সাথে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর গোপন যোগাযোগের তথ্যও নথিপত্রে সংরক্ষিত আছে।
গোলন্দাজ বাহিনী ও ৫ আগস্টের ‘গোপন ছক’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন দেশব্যাপী অস্থিরতা তুঙ্গে, তখন গোলন্দাজ বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত রহস্যজনক।
ব্রিগেডিয়ার রফিক এবং ডিজিএফআই-এর ব্রিগেডিয়ার তানভীর মাজহার সিদ্দিকীর সাথে হাসিনুর ও তার সহযোগীদের নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট চেইন অফ কমান্ড উপেক্ষা করে গোলন্দাজ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা স্নাইপার রাইফেল ও ৭.৬২ মিমি গোলাবারুদ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
আশ্চর্যজনকভাবে, দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনুর এখন নিয়মিত টেলিভিশনের টকশোতে এসে গর্বভরে দাবি করেন যে,
তিনি এবং তার দল ওই অস্থিরতায় সশস্ত্রভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
প্রশ্ন জাগে, একজন সাজাপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা জনসম্মুখে অস্ত্রধারী হওয়ার স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও রাষ্ট্র কেন নিশ্চুপ?
বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা ও ‘টার্গেটেড কিলিং’
১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ছিল ‘টার্গেটেড কিলিং’।
স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, এটি সাধারণ বিক্ষোভকারীদের কাজ ছিল না।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই কিলিং মিশনে উলফা, নাগা এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (ARSA)-এর পেশাদার খুনিদের ব্যবহার করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ম্যাথিউ ভ্যানডাইক, টেরেন্স আরভিল জ্যাকসন এবং রিচার্ড ড্যানিয়েল রোমান নামক অন্তত তিনজন আমেরিকান নাগরিকের সেই সময় বাংলাদেশে উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যারা গোপনে পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের ভূমিকা ছিল দাঙ্গা উসকে দেওয়া ও স্নাইপার পরিচালনার কারিগরি সহায়তা দেওয়া।
আদালত ও আড়ালে থাকা ‘প্রভাবশালী’ জেনারেলরা
হাসিনুর রহমানের মতো ব্যক্তিদের নেপথ্যে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান সোহরাওয়ার্দী।
২০১৪ সালে জেনারেল ভূঁইয়া সাজা শেষ হওয়ার আগেই হাসিনুরকে মুক্তি দেন। অভিযোগ রয়েছে,
আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে যে প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছিল,
তার কারিগর ছিলেন এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরাই।
স্নাইপার বুলেটের উৎস ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ
পুলিশ যখন রাবার বুলেট ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছিল,
তখন ভিড়ের পেছন থেকে বা উঁচু ভবন থেকে ৭.৬২ মিমি বুলেটের আঘাতে মানুষ মারা যাচ্ছিল।
পুলিশ সদস্যদের হত্যায় যে নিখুঁত নিশানার প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা কেবল পেশাদার সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব।
গোলন্দাজ ডিভিশনের অস্ত্রাগার থেকে এই ক্যালোবরের গুলি খোয়া যাওয়ার বিষয়টি এখন আর গোপন নেই, যদিও বর্তমান প্রশাসন তা চেপে যেতে চাইছে।
বিটকয়েন ট্রেডিং ও অর্থায়ন: ঘাতকদের অর্থনৈতিক উৎস
হাসিনুর, আফজাল এবং মহসিন কেবল প্রশিক্ষকই নন,
তারা তাদের উপার্জিত অর্থ শেয়ার বাজার এবং বিটকয়েন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।
তারা তুরস্ক থেকে ফিরে আসা বরখাস্তকৃত ব্রিগেডিয়ার আজমীর সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমিরের পুত্র আজমী বর্তমানে সেনাবাহিনীতে ‘ভারত-বিরোধী’ কর্মকর্তাদের একটি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং বর্তমান সেনাপ্রধানের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে শোনা যায়।
ইনডেমনিটি ও অন্ধকারের রাজনীতি
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে যখন বরখাস্তকৃত দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অস্ত্রের মহড়া দেয় এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাজপথে স্নাইপার চালায়, তখন সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো ধসে পড়ে।
৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশ হত্যার কোনো বিচার না করার যে ঘোষণা তারেক রহমান সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে,
তা এই ঘাতকদের দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি দেওয়ারই নামান্তর।
৭.৬২ মিমি বুলেটের ট্রেইলটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রির এক বিশাল ষড়যন্ত্রের দলিল।
এই ছায়া নায়কদের আড়াল থেকে বের করে আনা না হলে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা চিরকালই এক অদৃশ্য সুতোর টানে ঝুলতে থাকবে।
(চলবে…)
