সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের নিরপেক্ষতার আড়ালে বিএনপির সংসদীয় কোটা? সংরক্ষিত আসনে স্ত্রীর মনোনয়ন এবং ডিপ স্টেটের সমীকরণ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের টকশো জগতের এক পরিচিত নাম জিল্লুর রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে ‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এক নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে তিনি পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন, যা অনেক সময় ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার’ উদাহরণ হিসেবে ব্যব্হৃত হয়েছে। কিন্তু ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জিল্লুর রহমানের সেই ‘কট্টর বিরোধী’ অবস্থান এবং বর্তমানের প্রাপ্তিগুলো এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই নিরপেক্ষতা কি কেবলই একটি কৌশল ছিল?
আওয়ামী লীগ আমলে ‘চক্ষুশূল’ বনাম স্বাধীনতার স্বাদ
শেখ হাসিনার শাসনামলে জিল্লুর রহমান মিডিয়া পাড়ায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অনেক সময় তাঁকে সরকারের অন্যতম সমালোচক হিসেবে দেখা যেত। মজার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর এই বিষোদগার বা কঠোর সমালোচনা সহ্য করেছে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চরম ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা মিডিয়াকে যে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, জিল্লুর রহমান তার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ তখন ‘কাঠের চশমা’ পরে তাঁর সমালোচনা সয়ে গেছে, কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতেই বেরিয়ে আসছে সেই সমালোচনার নেপথ্য উদ্দেশ্য।
৫ই আগস্টের পর ভোলবদল: ‘মায়া কান্না’ ও প্রাপ্তির সমীকরণ
পটপরিবর্তনের পর জিল্লুর রহমানের আচরণে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এক সময়কার কঠোর সমালোচক এখন যেন আওয়ামী লীগের জন্য ‘মায়া কান্না’য় মগ্ন। কিন্তু এই কান্নার আড়ালে যে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির এক বিশাল পাহাড় দাঁড়িয়েছে, তা এখন আর গোপন নেই। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জিল্লুর রহমানের স্ত্রীর বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সেই গুঞ্জনের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এই মনোনয়ন কি জিল্লুর রহমানের স্ত্রীর রাজনৈতিক যোগ্যতার পরিচয়, নাকি এটি ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিক কোটায়’ জিল্লুর রহমানেরই প্রাপ্তি?
বিএনপি-প্রীতি এবং ‘সুবিধাবাদী’ সাংবাদিকতার ইতিহাস
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জিল্লুর রহমানের রাজনৈতিক শিকড় মূলত কট্টর বিএনপি বলয়ে প্রোথিত। অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তিনি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি বেছে নেন ‘অতিরিক্ত লীগ বিরোধী’ অবস্থান, যাতে বিরোধী শিবিরের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়।
আজ দিন বদলের পালায় তিনি তাঁর স্ত্রীকে ক্ষমতার আসনে বসিয়ে যেন ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে গেছেন।
ডিপ স্টেট ও সংরক্ষিত আসনের রহস্য
ডিপ স্টেটের কোনো এক অদৃশ্য সুতার টানেই কি এই মনোনয়ন?
সচেতন মহল মনে করছে, জিল্লুর রহমান নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করলেও তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুপরিকল্পিত।
সংরক্ষিত নারী আসনে তাঁর স্ত্রীর মনোনয়ন মূলত বিএনপির পক্ষ থেকে জিল্লুর রহমানকে দেওয়া একটি উপহার বা পুরস্কার। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক মনোনয়ন নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে করা ‘সুবিধাবাদী সাংবাদিকতার’ এক চূড়ান্ত ফসল।
“যখন সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অন্দরমহলে পরিবারের সদস্যদের জায়গা করে দেওয়া হয়, তখন সেই সাংবাদিকতা আর পবিত্র থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ রাজনৈতিক দালালি।”
ভাবীর অভিনন্দন নাকি ভাইয়ের বিজয়?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জিল্লুর রহমানের স্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর জোয়ার উঠেছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মনে গভীর সংশয়—অভিনন্দন কি সত্যিই ‘ভাবী’র প্রাপ্য? নাকি এটি জিল্লুর রহমান ভাইয়ের সেই ‘নিরপেক্ষ’ (?) সাংবাদিকতার এক গোপন চুক্তির প্রতিফলন? এই গভীর ভাবনা এখন টকশো থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা পর্যন্ত সবখানেই আলোচনার মূল বিষয়।
বার্তা কি?
জিল্লুর রহমান তাঁর চাতুর্যপূর্ণ সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজ ক্ষমতার ভাগবাঁটোয়ারার মিছিলে তাঁর সেই ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ।
স্ত্রী যখন সংরক্ষিত আসনের এমপি, তখন তাঁর টকশোতে নিরপেক্ষতার বুলি কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
তবে আপাতত এটি পরিষ্কার যে, জিল্লুর রহমান তাঁর ‘নিরপেক্ষ’ তকমা ব্যবহার করে ক্ষমতার সিড়ি বেয়ে অনেক ওপরে উঠে গেছেন।
