গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা ও ঐকমত্য কমিশনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা।
প্রেক্ষাপট: সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক
রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোট নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন এই প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে জনগণের স্পষ্ট ধারণা না থাকা ভোটের মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কোথায় এবং কীভাবে এই বক্তব্য
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার : সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জন-আকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
এই আলোচনার আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার-সহ বিচার বিভাগ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐকমত্য কমিশন নিয়ে প্রশ্ন
সারা হোসেন বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি “সিলেক্টিভ প্রসেস”, যেখানে সীমিত কয়েকজন ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কোথায় ছিল? বাইরের মতামত গ্রহণের সুযোগ কতটা ছিল?
তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকা জরুরি, যা এখানে অনুপস্থিত ছিল।
গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয়
গণভোটের বিষয়ে সারা হোসেন আরও কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভোটারদের একটি বড় অংশ জানতেন না তারা ঠিক কী বিষয়ে ভোট দিচ্ছেন।
বিশেষ করে তৃতীয় প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত ৩০টি প্রস্তাব সম্পর্কে জনগণের পরিষ্কার ধারণা ছিল না বলে তিনি দাবি করেন। তিনি উপস্থিতদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন—কয়জন আসলে এই প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে জানতেন?
তার মতে, “যদি ভোটাররা না জানেন তারা কিসের জন্য ভোট দিচ্ছেন, তাহলে সেই ভোটের মূল্য কতটুকু?”—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ক্ষোভ
সংস্কার কমিশনে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের আলোচনা হলেও সেখানে একজন নারী সদস্যও রাখা হয়নি।
তার মতে, এটি একটি বড় ঘাটতি, কারণ—
- বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য
- বিচার বিভাগে নারী বিচারপতিও রয়েছেন
- নারীর দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অতীতে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা আর কখনো হওয়া উচিত নয়।
তিনি বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত আইনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তার মতে, এসব আইনের মাধ্যমে বিচারপতিদের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাইয়ের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আর্থিক স্বাধীনতার অভাব বিচার বিভাগের কার্যকারিতাকে দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অতীত ঘটনার উদাহরণ
আলোচনায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা-র দেশত্যাগ এবং এ বি এম খায়রুল হক-এর কারাবাসের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
সারা হোসেন বলেন, এসব ঘটনায় নাগরিক সমাজের নীরবতা উদ্বেগজনক। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
বিশ্লেষণ: কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে—
- গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
- ভোটার সচেতনতা
- অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নির্ধারণ
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
