জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশের পোশাক খাতে অর্ডার কমছে, বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে ঝুঁকছে—বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামনে।
জ্বালানি অনিশ্চয়তায় নতুন সংকটের ইঙ্গিত
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এখন নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে। জ্বালানি ঘাটতির সম্ভাবনা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিরতার আশঙ্কায় অনেক বিদেশি ক্রেতা ইতোমধ্যে তাদের অর্ডার স্থগিত বা অন্য দেশে স্থানান্তর করতে শুরু করেছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরে।
বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার সংকট
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) জানান, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে অনেক বড় ক্রেতা এখন বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট মৌসুমের জন্য প্রত্যাশিত অর্ডার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারতসহ অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকছে।
রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য বড় ধাক্কা
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে অর্ডার কমে গেলে তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং শিল্প প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
কর ব্যবস্থার চাপ বাড়াচ্ছে সংকট
বিসিআই সভাপতি বর্তমান কর কাঠামোকেও ব্যবসার জন্য বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, লাভ-লোকসান নির্বিশেষে ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা না করেও কর দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের টিকে থাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা
কর যাচাইয়ের নামে প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিপত্র বা কম্পিউটার জব্দ করার ক্ষমতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এতে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়, তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
কর সংস্কারের প্রস্তাব ও প্রতিক্রিয়া
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে,
যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা স্বস্তি পায়। পাশাপাশি অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানোর সুপারিশও করা হয়েছে।তবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর
রহমান খান জানিয়েছেন, রাজস্ব আহরণের স্বার্থে উৎসে কর কমানোর সুযোগ নেই, বরং ভবিষ্যতে তা বাড়ানোর বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা।
তা না হলে তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নীতি সহায়তা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা, কর ব্যবস্থার চাপ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে খাতটি চ্যালেঞ্জের মুখে।
এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ, যাতে আস্থা ফিরে আসে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় থাকে।
