বাংলাদেশ ও ইইউ-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক PCA চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানমূলক রিপোর্ট।
ব্রাসেলসের নীল আকাশ যখন কূটনৈতিক হাসিতে উজ্জ্বল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর এক দীর্ঘ ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। ২০ এপ্রিল ২০২৬, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ইইউ-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পাম্পালনি এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে প্রাথমিক স্বাক্ষর করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ইইউ-এর হাই রিপ্রেজেনটেটিভ কাজা কাল্লাসের উপস্থিতিতে সম্পাদিত এই ‘পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট’ (PCA) আপাতদৃষ্টিতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব মনে হলেও এর প্রতিটি ধারায় লুকিয়ে আছে কঠিন শর্তের বেড়াজাল।
রহস্যময় নীরবতা: কেন এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা নেই?
এত বড় একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হলো, অথচ বাংলাদেশের টকশো বা নিউজ পোর্টালে কেন এই নিয়ে টুঁ শব্দটিও নেই? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তির পেছনে রয়েছে ‘সন্ধ্যাবেলার নির্বাচনের’ সেই বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি, যা ইইউ-এর সাথে এক ধরনের ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ বা বিনিময় প্রথার অংশ। দেশের সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে জাতীয় স্বার্থকে কি কোনো আন্তর্জাতিক এজেন্ডার কাছে জিম্মি করা হয়েছে? এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ২০২৬: ইবিএ (EBA) সুবিধার অবসান
২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ ঘটাবে, ঠিক তখনই ইইউ-এর ‘Everything But Arms’ (EBA) স্কিমের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এক অশনিসংকেত। পিসিএ চুক্তির মাধ্যমে ইইউ মূলত বাংলাদেশকে একটি নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করছে, যেখানে গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য সুবিধা পেতে হলে ইউরোপের দেওয়া কঠিন সব রাজনৈতিক ও আইনি শর্ত মেনে চলতে হবে।
জিএসপি প্লাস (GSP+): শর্তের বেড়াজালে রপ্তানি খাত
বাংলাদেশ বর্তমানে ইইউ-এর কাছে GSP+ সুবিধা চাচ্ছে। কিন্তু এই সুবিধা পাওয়া কি এতই সহজ? এর জন্য আইএলও (ILO) কনভেনশন মেনে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা, ইবিজেডে ট্রেড ইউনিয়নের অবাধ স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। রানাপ্লাজা পরবর্তী সময়ে ইইউ-এর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই শর্তগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তৈরি পোশাকের ওপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এক নিমেষে ধ্বংস করে দেবে।
মানবাধিকার ও সুশাসন: পলিটিক্যাল ডায়ালগের চাপ
পিসিএ চুক্তিতে মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনকে ‘মৌলিক ভিত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইইউ এর আগে একাধিকবার বাংলাদেশের নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন এই চুক্তির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের একটি আইনি পথ খুঁজে পেল।
যেকোনো ঘাটতি দেখলে ইইউ এখন ‘রাজনৈতিক সংলাপ’ বাড়ানোর নামে বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত করার হুমকি দিতে পারবে।
প্রতিযোগিতার মাঠে একাকী বাংলাদেশ
বাংলাদেশ যখন এলডিসি উত্তরণের সংকটে, ঠিক তখনই ইইউ ভারত ও ভিয়েতনামের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পন্ন করেছে।
এতে ভিয়েতনামের পোশাক খাত বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের লজিস্টিক সাপোর্ট, এনার্জি সেক্টর এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা আমাদের রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামাতে পারে।
অভিবাসন ও নিরাপত্তা: বাড়তি চাপের বোঝা
চুক্তির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা।
এর ফলে ইইউ থেকে অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত আনা এবং জলবায়ু তহবিলের নামে অতিরিক্ত শর্ত পূরণে ঢাকাকে চরম চাপে থাকতে হবে।
সমালোচকরা বলছেন, আমেরিকার সাথে কথিত ‘গোলামী চুক্তির’ পর এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইউরোপের সাথেও এক অসম চুক্তির মাধ্যমে দেশ ও তরুণ সমাজকে বিদেশি এজেন্ডার ইজারাদার বানিয়ে দিয়েছেন।
জাতীয় স্বার্থ বনাম আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি
অংশীদারিত্ব ভালো, কিন্তু সেটি যদি একপাক্ষিক শর্তের ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে তা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
২০ এপ্রিলের এই চুক্তি কি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে, নাকি ২০২৬ পরবর্তী সময়ে আমাদের বাণিজ্য ও রাজনীতিকে ইউরোপের হাতের পুতুলে পরিণত করবে? গণমাধ্যমের নীরবতা ভাঙার সময় এসেছে। দেশের মানুষকে জানতে হবে—এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল আর কী হারালো।
