৫ কেজির কম ওজনের শিশুদের জন্য প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধ অনুমোদন দিল WHO। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে নতুন যুগের সূচনা।
শিশুস্বাস্থ্যে নতুন মাইলফলক
বিশ্ব স্বাস্থ্যখাতে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। World Health Organization (ডব্লিউএইচও) নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য বিশ্বের প্রথম ম্যালেরিয়ার ওষুধ অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস (২৫ এপ্রিল) উপলক্ষে এই ঘোষণা এসেছে, যা বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শিশুদের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন ওষুধের বৈশিষ্ট্য
নতুন এই ওষুধটি তৈরি করা হয়েছে আর্টিমেথার ও লুমেফ্যান্ট্রিনের সংমিশ্রণে। এটি বিশেষভাবে ৫ কেজির কম ওজনের শিশুদের জন্য তৈরি—যা আগে কখনো ছিল না।
এতদিন ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের জন্য তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হতো, যা ডোজ নির্ধারণে ভুল এবং বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করত। নতুন এই ওষুধ সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিশুদের ওপর ম্যালেরিয়ার ভয়াবহ প্রভাব
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা ম্যালেরিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই এই বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটে।
পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক—
- প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার গর্ভবতী মা ম্যালেরিয়ায় মারা যান
- প্রায় ২ লাখ মৃত শিশু জন্মের ঘটনা ঘটে
- প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮ কোটি ২০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখেরও বেশি।
সাব-সাহারান আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি
বিশ্বের মোট ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ও মৃত্যুর ৯০ শতাংশই ঘটে Sub-Saharan Africa অঞ্চলে। এই অঞ্চলে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি শিশু জন্ম নেয়, যারা ম্যালেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
নতুন এই ওষুধ সেই শিশুদের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সহজতর অনুমোদন ও ব্যবহার
ডব্লিউএইচওর অনুমোদনের ফলে বিভিন্ন দেশ এখন পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়াই এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে।
পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সরকারগুলোর অনুমোদন সাপেক্ষে দ্রুত এই ওষুধ সংগ্রহ ও বিতরণ করতে পারবে।
এতে করে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকাগুলোতে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
WHO প্রধানের মন্তব্য
ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক Tedros Adhanom Ghebreyesus বলেন, “শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ম্যালেরিয়া অসংখ্য শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।”
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ম্যালেরিয়া শনাক্তে তিনটি নতুন র্যাপিড টেস্টও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত রোগ শনাক্তে সহায়ক হবে।
বৈশ্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
নতুন এই ওষুধ এবং উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিশুদের জন্য প্রথম ম্যালেরিয়া ওষুধের অনুমোদন বিশ্ব স্বাস্থ্যখাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু চিকিৎসার নতুন দিগন্তই খুলবে না,
বরং লাখো শিশুর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন এই ওষুধের কার্যকর বাস্তবায়নই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
