তীব্র গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ খাতে সমন্বয়হীনতা ও অর্থ সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা।
প্রচণ্ড গরম আর অসহনীয় লোডশেডিং—এই দুইয়ের চাপে নাজেহাল দেশের জনজীবন। দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে মূলত দায়ী অব্যবস্থাপনা ও সরকারি বিভাগগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা।
তাপদাহে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ
শনিবার ছুটির দিনেও দুপুরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। গনগনে রোদ আর তীব্র তাপদাহে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি আগেই অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে ঘাটতি
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে এর অনেকটাই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরে চাহিদা ছিল ১৪,৫৭৪ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১২,২৮৭ মেগাওয়াট।
ফলে প্রায় ২,২৮৭ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি লোডশেডিং হিসেবে জনগণের ওপর চাপ ফেলছে।
জ্বালানি সংকট ও বকেয়ার চাপ
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট ও বিপুল বকেয়া। জানা গেছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। এই অর্থ সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা, গ্যাস বা ফার্নেস অয়েল কিনতে পারছে না।
গ্যাস সরবরাহও কমে গেছে। গত বছর যেখানে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৯২ কোটিতে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও সমস্যা
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও কয়লার মান খারাপ, কোথাও আবার বকেয়া বিল ও চুক্তিগত জটিলতা উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, যা সামগ্রিক সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলছে।
অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগের দ্বন্দ্ব
এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অর্থ বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। ভর্তুকির টাকা ছাড়ে নতুন নতুন শর্ত
আরোপ করায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ভর্তুকির একটি অংশ ছাড় দেওয়া হলেও সেটির সঙ্গে ১৩টি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
আবার অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাবও নাকচ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ খাতের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের আগে যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হলে এই সংকট অনেকটাই এড়ানো যেত।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ চলছে।
বৃষ্টি ছাড়া স্বস্তি নেই?
সংশ্লিষ্টদের মতে, আপাতত বৃষ্টি না হলে এই সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া কঠিন। কারণ, বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে,
তা পূরণের মতো প্রস্তুতি নেই। লোডশেডিং এখন শুধু বিদ্যুতের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্রুত সমন্বয়, বকেয়া পরিশোধ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
