মার্শাল আর্ট শিখিয়ে তরুণদের টিটিপি ও আল-কায়েদার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (FCS)। বসিলা থেকে কিশোরগঞ্জের চরাঞ্চল—বিস্তৃত এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক।
বিশেষ অনুসন্ধানী দল | ঢাকা ২৭ এপ্রিল, ২০২৬;
বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতার ধরনে এসেছে এক ভয়াবহ পরিবর্তন। সাধারণ চোখে যা কেবল শারীরিক কসরত বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ, তার আড়ালেই চলছে তরুণদের মগজ ধোলাই এবং তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর আদলে ‘তেহরিকে তালেবান বাংলাদেশ’ (TTB) গঠনের এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। এই পুরো কার্যক্রমের নেপথ্যে রয়েছে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (FCS) নামক একটি নামসর্বস্ব সংগঠন। সম্প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ তথ্যের ভিত্তিতে এই নেটওয়ার্কের যে রোমহর্ষক চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগজনক বার্তা।

ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম: প্রশিক্ষণের আড়ালে মগজ ধোলাই
সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছে শাহ আমানত সাবির নামক এক ব্যক্তি। ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম বর্তমানে খুলনা, যশোর ও চাঁদপুরের মতো জেলাগুলোতে এবং সুতারখালী ও অভয়নগরের মতো উপজেলা পর্যায়ে তাদের শাখা বিস্তার করেছে। স্থানীয় স্টেডিয়ামগুলোতে তারা ‘সেলফ ডিফেন্স’ বা আত্মরক্ষার কৌশলের নামে জনসম্মুখে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এর গভীরে রয়েছে ভিন্ন চিত্র।
প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে প্রাথমিকভাবে সরাসরি কোনো উগ্রবাদী আলোচনা করা হয় না। বরং তাদের নিয়ে গঠন করা হয় গোপন ‘টেলিগ্রাম’ গ্রুপ।
সেখানে কৌশলে টিটিপি ও আল-কায়েদার মতাদর্শী বিভিন্ন উগ্রবাদী বয়ান ও ভিডিও শেয়ার করা হয়।
এই শেয়ার করা কন্টেন্টের ওপর প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিক্রিয়া বা মতামত দেখে তাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা হয়।
যারা এই উগ্র মতাদর্শের প্রতি আগ্রহ দেখায়, কেবল তাদেরই পরবর্তী ধাপের জন্য ‘বাছাই’ করে সংগঠনটি।

বসিলা টু নিকলী: আবাসন প্রকল্পের আড়ালে সশস্ত্র আখড়া
রাজধানীর বসিলা এলাকায় বিদেশি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত একটি আবাসন প্রকল্পের আড়ালে চলছে এই নেটওয়ার্কের মূল প্রশাসনিক কাজ।
অভিযোগ রয়েছে, এই আবাসন প্রকল্পের আড়ালেই টিটিপি-এর জন্য লোক রিক্রুটমেন্ট বা সদস্য সংগ্রহের প্রাথমিক কাজ সারে সাবিরের চক্র।
বাছাইকৃত তরুণদের এরপর নিয়ে যাওয়া হয় দুর্গম চরাঞ্চলে।
বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের নিকলীর ছাতির চর ইউনিয়নের মতো প্রত্যন্ত এলাকাগুলোকে তারা সশস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করছে।
সেখানে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানো এবং গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখানো হয়।
এই প্রশিক্ষণের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাছাইকৃত যুবকদের আফগানিস্তানে পাঠিয়ে টিটিপি-এর হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ানো।
‘বাংলাস্তানের জঙ্গি’: প্রচারণার ডিজিটাল ফ্রন্ট
শাহ আমানত সাবিরের এই মিশনের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মোঃ মাহফুজুর রহমান।
মাহফুজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বাংলাস্তানের জঙ্গি’ নামক একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে।
সে দেশের বিভিন্ন জেলায় ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের ‘আখড়া’ বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শক হিসেবে যায় এবং বাছাই প্রক্রিয়ায় কারিগরি ও আদর্শিক সহায়তা প্রদান করে।
শনাক্তকৃত নেটওয়ার্ক ও গোপনীয়তার কৌশল
এই চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাদের যোগাযোগ রক্ষা করে।
তদন্তে দেখা গেছে, তাদের ব্যবহৃত প্রতিটি মোবাইল নম্বর অন্যের নামে বা ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত।
এখন পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত যাদের শনাক্ত করা গেছে তারা হলো: ১. শাহ আমানত সাবির (প্রধান সমন্বয়ক) ২. মোঃ মাহফুজুর রহমান (প্রচারণা ও প্রশিক্ষক) ৩. মোঃ হেমায়েত হোসেন ৪. মোঃ শাদাত ৫. আবু সুফিয়ান
টিটিবি (TTB) গঠন: আফগানিস্তান ফেরত উগ্রপন্থীদের ভূমিকা
তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটির সাথে আফগানিস্তান ফেরত কয়েকজন উগ্রপন্থীর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
তারা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশে তেহরিকে তালেবান বাংলাদেশ (TTB) গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
টিটিপি যেভাবে পাকিস্তানে সক্রিয়, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে একটি সশস্ত্র উগ্রবাদী ফ্রন্ট তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
মার্শাল আর্ট সেন্টারের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের জনবল সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা প্রচলিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও নিরাপদ।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতি আহ্বান
মার্শাল আর্ট সেন্টারের আড়ালে কিশোর-তরুণদের বিপদগামী করার এই কার্যক্রম এখনই বন্ধ না করলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলায় রূপ নিতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশি অর্থায়ন ও এনজিও বা আবাসন প্রকল্পের আড়ালে এমন তৎপরতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
নিরাপত্তা সংস্থাসমূহকে দ্রুত এই নেটওয়ার্কের শিকড় উপড়ে ফেলার এবং শনাক্তকৃত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে।
