গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে দখল, মব সন্ত্রাস ও ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিকে সরানোর ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে দখল ও মব অভিযোগে বিতর্ক তুঙ্গে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিকে জোরপূর্বক সরানো, কথিত মব সন্ত্রাস, এবং বিতর্কিত ট্রাস্টি বোর্ড গঠন—এসব ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও গুরুত্ব
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের ত্রিপুরায় প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ থেকেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের যাত্রা শুরু। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি বৃহৎ স্বাস্থ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
সাভারের মির্জানগরে এর সদর দপ্তর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ৪৩টির বেশি উপকেন্দ্র। স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এটি স্বাধীনতা পুরস্কারও অর্জন করেছে।
দখল ও মব সন্ত্রাসের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির একটি দল প্রবেশ করে এবং একপ্রকার মব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ সময় প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়েরকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডা. নাজিমউদ্দিন দাবি করেন, তাকে হুমকি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রভাবশালী মহলের নির্দেশনা ছিল।
রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এই ঘটনায় সাবেক সরকারি উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুযোগটি কাজে লাগান।
ডা. নাজিমউদ্দিনের দাবি, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা ফোনের মাধ্যমে নির্দেশনা পাচ্ছিলেন এবং সেখানে তাকে সরানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বিতর্কিত ট্রাস্টি বোর্ড গঠন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়,
যেখানে সাতজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ লঙ্ঘন করে।
আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছাড়া নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বাইরে নতুন সদস্যদের
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকরা বলছেন, এটি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি কৌশল।
দুর্নীতির অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ডা. নাজিমউদ্দিন জানান,
তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন বিভাগে অডিট শুরু করেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থাকেন।
এই পদক্ষেপেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাকে সরানোর পরিকল্পনা করে বলে অভিযোগ।
এমনকি পূর্বে বরখাস্ত হওয়া কয়েকজন কর্মীকেও নতুন ট্রাস্টি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মব ঘটনার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ৫০-৬০ জনের একটি দল অফিসে ঢুকে কয়েক ঘণ্টা ধরে চাপ সৃষ্টি করছে।
ডা. নাজিমউদ্দিনকে ঘিরে ধরে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ঘটনাস্থলে প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে মবের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে চলমান বিতর্ক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং এটি দেশের স্বাস্থ্যখাত ও সুশাসনের প্রশ্নও তুলে ধরছে।
প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, অবদান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
এ পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
