কূটনৈতিক শিষ্টাচার না কি সার্বভৌমত্বের অবমাননা? মার্কিন দূতের ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ তারেক সরকার: লুণ্ঠনের মুখে বাংলাদেশের সম্পদ
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক | ঢাকা |০৩ মে, ২০২৬‘;
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের অতিসক্রিয়তা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি যেভাবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করছেন, তা কেবল কূটনৈতিক প্রথাকে ভঙ্গ করছে না, বরং দেশের সার্বভৌমত্বকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দৃশ্যত মার্কিন ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে।
ক্রিস্টেনসেনের ‘দরবার’: ক্ষমতার অলিন্দে মার্কিন আধিপত্য
গত ১০ জানুয়ারি ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই তার তৎপরতা ছিল নজরকাড়া। প্রথাগতভাবে একজন রাষ্ট্রদূতের কাজ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন হলেও, ক্রিস্টেনসেন গত দুই মাসে প্রায় দুই ডজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেই নন, বরং তিন বাহিনীর প্রধান—সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গেও নিয়মিত বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন বিদেশি দূতের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এই ধরণের সরাসরি এবং নিয়মিত যোগাযোগ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
আরটিএ চুক্তির মরণফাঁদ: অর্থনীতির ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি স্থায়ী পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা আরটিএ (RTA)। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই বিতর্কিত চুক্তিটি সই হয়।
এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিটি পদক্ষেপে এখন ওয়াশিংটনের অনুমোদনের ছায়া রয়েছে। যদিও চুক্তিতে ৬০ দিনের মধ্যে বাতিলের সুযোগ ছিল, কিন্তু তারেক সরকার সেই পথ মাড়ায়নি। বরং গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩৭ হাজার কোটি টাকার উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করে এই আরটিএ-এর এক ভয়ংকর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
৩৭ হাজার কোটি টাকার ‘বোয়িং গেট’: পর্দার আড়ালে কারা?
বোয়িং চুক্তির নেপথ্য কাহিনী রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। গত ৩ মার্চ মার্কিন দূত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার সঙ্গে নিভৃতে বৈঠক করেন। মজার বিষয় হলো, রিতা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মুন্নু গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা। এই বৈঠকের ঠিক এক সপ্তাহ আগে র্যাংগস গ্রুপের রুমি হোসেনকে বিমানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই অদ্ভুত মিশেলে দ্রুততম সময়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকার চুক্তিটি সই হয় ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যেখানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর, সেখানে এই বিশাল অংকের বিলাসিতা কার স্বার্থে?
জ্বালানি খাতে ‘আমেরিকান থাবা’: শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জি
বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের ওপর শকুনি দৃষ্টি পড়েছে মার্কিন করপোরেট জায়ান্টদের।
গত ১২ এপ্রিল পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে বৈঠকে ক্রিস্টেনসেন স্পষ্ট করেন যে, শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে প্রস্তুত।
উল্লেখ্য, আবদুল আউয়াল মিন্টুর নিজস্ব কোম্পানি মাল্টিমোড গ্রুপের এই দুটি মার্কিন কোম্পানিতে শেয়ার রয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের নেপথ্য নায়ক হিসেবে পরিচিত সাবেক মার্কিন দূত পিটার হাস এখন ‘এক্সিলারেট বাংলাদেশ’-এর নেতৃত্বে রয়েছেন।
ইউনূস সরকারের করা উচ্চমূল্যের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির পর এখন সমুদ্রের গ্যাস ব্লকগুলোও মার্কিন কবজায় যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
কৃষিতে করপোরেট সাম্রাজ্যবাদ: ক্ষুদ্র কৃষকের অস্তিত্ব সংকট
২৭ এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠকে ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষিতে মার্কিন ‘দক্ষতা’ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
এর আগে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদের সঙ্গেও তার গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আরটিএ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির গ্যারান্টি দিতে হয়েছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিভর্তুকি তুলে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্র মূলত বাংলাদেশের বিশাল বাজারকে করপোরেট কৃষিব্যবস্থার দাসে পরিণত করতে চায়।
এতে দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষক জমি হারিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য হবেন।
উন্নয়ন বনাম লুণ্ঠন: আমেরিকার অবদান বনাম স্বার্থ
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়নে অবদান রেখেছে জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো।
দেশের বড় বড় সেতু, কালভার্ট, মেগা প্রজেক্ট বা ইপিজেড—কোথাও কি আমেরিকার কোনো অবদান চোখে পড়ে? উত্তর হলো ‘না’।
স্বাধীনতার পর থেকে আমেরিকা কেবল বাংলাদেশ থেকে নিয়েছে।
শেখ হাসিনার সরকার যে মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলেছিলেন, আজ সেই সমৃদ্ধির ওপর নজর পড়েছে আমেরিকার।
রেমিট্যান্স এবং প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেওয়ার এক মহাউৎসবে মেতেছে মার্কিন প্রশাসন ও তাদের এ দেশীয় দোসররা।
হামিদ কারজাইয়ের পরিণতি কি অবধারিত?
বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, মার্কিন মদদপুষ্ট এই তথাকথিত ইউনূস-তারেক-খলিল চক্র দেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই যেভাবে মার্কিন প্রভু ছেড়ে পালিয়েছিলেন, বর্তমান শাসকদের পরিণতিও তার চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে যে অতিমাত্রার মার্কিন নির্ভরতা তৈরি করা হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই বুমেরাং হবে।
এখন সময় এসেছে ‘দুষ্ট’ আমেরিকার উদ্দেশ্য বোঝার এবং দেশের লুণ্ঠিত সম্পদ রক্ষায় দেশপ্রেমিক জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
শেষকথা:
বাংলাদেশের ভূখণ্ড আজ এক নতুন ধরণের ছায়া যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু।
কূটনৈতিক মোড়কে আসা লুণ্ঠনকারীদের এখনই প্রতিহত করা না গেলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক নিঃস্ব ও দেউলিয়া রাষ্ট্রের বোঝা বইতে হবে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতাই এখন শেষ ভরসা।
