পটুয়াখালীর বাউফলে সরকারি অর্থে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি টয়লেট নির্মাণ ঘিরে তোলপাড়। জামায়াত নেতা ও এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ – ভিডিও ভাইরাল ।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার রামনগর গ্রামে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত দুটি টয়লেট নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর সূত্র ধরে জানা গেছে, অত্যন্ত সাধারণ মানের দুটি টয়লেট নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। এই অস্বাভাবিক নির্মাণ ব্যয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একটি জনপদ যেখানে মৌলিক অবকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে, সেখানে দুটি টয়লেটের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা কি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত?
ভাইরাল ভিডিও ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
সম্প্রতি ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামনগর গ্রামের ওই টয়লেট দুটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, সাধারণ ইটের গাঁথুনি ও পলেস্তারা করা দুটি টয়লেট, যা নির্মাণে কোনোভাবেই কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা নয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাউফলজুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উন্নয়নের নামে সরকারি অর্থের এমন নয়ছয় এর আগে তারা দেখেননি। এটি কেবল অপচয় নয়, বরং জনগণের করের টাকার প্রকাশ্য লুণ্ঠন।
নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা: প্রকৌশলবিদ্যার বাইরে এক ‘জাদু’
প্রকৌশলীদের মতে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি উন্নত মানের পাবলিক টয়লেট নির্মাণেও সর্বোচ্চ কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে।
কিন্তু বাউফলের এই প্রকল্পে প্রতিটি টয়লেটের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা।
- বাজারমূল্য বনাম বরাদ্দ: বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই স্থাপনাগুলোর প্রকৃত ব্যয় বড়জোর ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার মধ্যে হওয়ার কথা।
- অবকাঠামোগত ত্রুটি: ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, টয়লেটগুলোর মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সেখানে কোনো বিশেষ প্রযুক্তি বা বহুমূল্যবান সামগ্রী ব্যবহারের চিহ্ন নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ‘পেইপার প্রজেক্ট’ বা কাগজে-কলমে ব্যয় বাড়িয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি নিখুঁত উদাহরণ হতে পারে।
এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এই প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা হওয়ায় অভিযোগের তীর সরাসরি তার দিকেই যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংসদীয় কোটার সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
বরং নিজের অনুগতদের মাধ্যমে এই অর্থ ভাগবাটোয়ারা করার জন্য এই ‘হাস্যকর’ ব্যয় দেখানো হয়েছে।
একজন ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তার নির্বাচনী এলাকায় এমন দুর্নীতির খবর জামায়াতের ভাবমূর্তির ওপরও বড় ধাক্কা দিয়েছে।
বিরোধীরা বলছেন, মুখে আদর্শের কথা বললেও কাজে এই এমপি ‘টেন্ডারবাজি’ ও ‘কমিশন বাণিজ্যে’ লিপ্ত।
প্রশাসনিক নীরবতা ও দায়বদ্ধতার অভাব
এত বড় অংকের টাকা একটি ক্ষুদ্র প্রকল্পে কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের ওপরও।
সাধারণত বড় কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়।
কিন্তু ২ কোটি টাকার এই টয়লেট প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন ও এমপি’র যোগসাজশ ছাড়া এমন অবাস্তব বরাদ্দ পাওয়া অসম্ভব।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও স্থানীয় জনজীবন
বাউফলের অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, ব্রিজ-কালভার্ট ব্যবহারের অযোগ্য এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র নেই।
এমন পরিস্থিতিতে কোটি কোটি টাকা টয়লেটের পেছনে ব্যয় করাকে ‘জনগণের সাথে তামাশা’ হিসেবে দেখছেন সচেতন সমাজ।
রামনগর গ্রামের একজন বাসিন্দা ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমাদের হাঁটার রাস্তা নেই, বৃষ্টির সময় কাদা ভেঙে চলতে হয়।
অথচ এমপির লোকরা টয়লেট বানিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।”
নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি
পটুয়াখালীর বাউফলের এই ‘টু-ক্রোর টয়লেট’ এখন জাতীয়ভাবে একটি আলোচিত ইস্যু।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমের একটি খণ্ডচিত্র।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগের যদি সুষ্ঠু তদন্ত না হয়, তবে জনগণের মধ্যে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে এই প্রকল্পের নথিপত্র তলব করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
শৈল্পিক টয়লেটের নামে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। বাউফলের মানুষ এখন বিচারের আশায় প্রহর গুনছে।
