২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির নেপথ্যে কি কোনো ‘পরোক্ষ অভ্যুত্থান’ ছিল? কীভাবে গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পুলিশের মনোবল ভেঙে সরকার পতন ত্বরান্বিত করা হয়?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪ একটি অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই পতন কি শুধুই গণ-আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত ফলাফল, নাকি এর পেছনে কাজ করেছিল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাজানো এক ‘পরোক্ষ অভ্যুত্থান’ (Indirect Coup)? সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এনায়েত কবিরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্দরমহলের সমীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৪ আগস্টের সেই গোপন টেলিকনফারেন্স: ভাগ্য নির্ধারণের রাত
প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ভাগ্য মূলত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল ৫ আগস্টের আগের রাতে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দিবাগত গভীর রাতে শীর্ষ সেনা জেনারেলদের মধ্যে একটি অত্যন্ত গোপন টেলিকনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।
ওই আলাপচারিতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, সেনাবাহিনী আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সরকারের পাশে থাকবে না।
অথচ আশ্চর্যজনকভাবে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সরকারপ্রধানকে আশ্বস্ত করে আসছিলেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই ‘মিথ্যা আশ্বাস’ মূলত একটি কৌশলী অবস্থান ছিল বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
পুলিশের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার নীল নকশা
একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার হলো তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শেখ হাসিনা সরকারকে অকেজো করতে প্রথমেই লক্ষ্যবস্তু করা হয় পুলিশ বাহিনীকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের উত্তাল সময়ে সারা দেশে প্রায় ৪০০ থানায় সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
নিরস্ত্র পুলিশের ওপর এই আক্রমণ এবং অস্ত্র লুটের ঘটনাটি ছিল বাহিনীটির মনোবল সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার একটি ছক।
যখন পুলিশ পিছু হটে, তখন বেসামরিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগ পুরোপুরি সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই পরনির্ভরশীলতাই মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেয়।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা?
যেকোনো বড় ধরনের গণঅসন্তোষের আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারকে আগাম সতর্কবার্তা দেয়।
কিন্তু নর্থইস্ট নিউজের দাবি, তৎকালীন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জেনেশুনেই সরকারকে সঠিক তথ্য সরবরাহ থেকে বিরত ছিলেন।
মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক ও মেজর জেনারেল জুবায়েরের মতো কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে এখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছিলেন যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়? এই প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক মহলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চেইন অব কমান্ডের ভাঙন
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন বিভাজন কাজ করছিল।
সিজিএস লে. জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম এবং কিউএমজি লে. জেনারেল (অব.) মজিবুর রহমানের সঙ্গে সেনাপ্রধানের মতপার্থক্য প্রকট ছিল।
এই সংকট কাটাতে তিনি সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মতিউর রহমানের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ডের শিথিলতা ক্ষমতা পরিবর্তনের পথকে আরও প্রশস্ত করে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল সোহেল: এক বন্দী ও বলির পাঁঠা
প্রতিবেদনের অন্যতম বিস্ফোরক অংশ হলো রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহেলকে নিয়ে।
সাবেক এই র্যাব কর্মকর্তা শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে আগেই মেসেজ দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, সশস্ত্র বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা একটি ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’।
এই সত্যটি জানার কারণেই পরবর্তীতে ২০ আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নাম ব্যবহার করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে সোহেলকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
উদ্দেশ্য ছিল, তাঁকে দিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় ‘রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী’ বানানো এবং তারিক সিদ্দিকীকে পালানোর সহায়তাকারী হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায় করা।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
নিরাপত্তা বলয় হ্রাসের পুরনো পরিকল্পনা
শেখ হাসিনার পতন হুট করে হয়নি বরং এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বেশ আগে থেকেই—এমনটিই মনে করেন এনায়েত কবির। ২০০৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে বিশ্বস্তভাবে কাজ করা মেজর (অব.) শোয়েব এবং মেজর (অব.) মামুনকে ২০২১ সালে রহস্যজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। এটি ছিল মূলত প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়কে ভেতর থেকে দুর্বল করার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
‘ডিপ স্টেট’ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
বাংলাদেশের এই পটপরিবর্তনে বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ইউএসএআইডির অর্থায়ন, বাইডেন প্রশাসনের নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রভাবশালী ব্যক্তি যেমন ইলন মাস্ক বা জর্জ সোরোসের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নানা সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জের সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে ‘ডিপ স্টেট’ বা পর্দার আড়ালের সরকার পরিচালনার বিষয়টি এখন জনমনে প্রবল আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।
নর্থইস্ট নিউজের এই প্রতিবেদনে যেসব দাবি করা হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি সেনাপ্রধানের মিথ্যা আশ্বাস, গোয়েন্দাদের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি এবং পুলিশ বাহিনীকে সুকৌশলে ধ্বংস করার দাবিগুলো সত্য হয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদনের কোনো আনুষ্ঠানিক খণ্ডন বা ব্যাখ্যা আসেনি।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার রদবদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, যদি তা কোনো ‘পরোক্ষ অভ্যুত্থান’ বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঘটে থাকে, তবে তার স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। জনমনে তৈরি হওয়া এই গভীর সংশয় নিরসনে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি।
