কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় সাইফুল ইসলামকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ। ছাত্রদল নেতার সম্পৃক্ততা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির এক চিত্র ফুটে উঠেছে সাইফুল ইসলাম (৫১) নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায়। গত ৭ মে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বরুড়া উপজেলায় নিজ বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ এবং স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, এই অপহরণের পেছনে রয়েছে ছাত্রদল রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু সন্ত্রাসীর দাপট ও আর্থিক লালসা।
গভীর রাতে হামলা: যেভাবে শুরু সেই আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটা। বরুড়া উপজেলার সাধারণ এক নাগরিক সাইফুল ইসলাম যখন নিজ ঘরে বিশ্রামে ছিলেন, ঠিক তখনই একদল সশস্ত্র যুবক তার ওপর চড়াও হয়। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ছাত্রদল নেতা সাদ্দামের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী জোরপূর্বক সাইফুলকে তার নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। কোনো আইনি পরোয়ানা বা অভিযোগ ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতি বর্তমানে জনমনে চরম অনিরাপত্তার জন্ম দিয়েছে।
স্কুল মাঠে বর্বরতা ও চাঁদা দাবি
অপহরণের পর সাইফুলকে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটবর্তী একটি স্কুল মাঠে। সেখানে নির্জন পরিবেশে তাকে পৈশাচিক কায়দায় মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বস্ত সূত্রমতে, এই মারধরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘চাঁদা আদায়’।
- শারীরিক নির্যাতন: সাইফুলকে বেধড়ক পেটানোর পর তার কাছে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়।
- অব্যাহত হামলা: ভিক্টিম দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুক্রবার ভোররাত পর্যন্ত কয়েক দফায় তার ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে নাটকীয় মোড়
সন্ত্রাসীরা ভেবেছিল এই ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাবে। কিন্তু নির্যাতনের খবর এলাকাবাসীর কান অব্দি পৌঁছে যায় এবং দ্রুতই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকের এই চাপের মুখে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সন্ত্রাসীরা কৌশল বদল করে। নির্যাতিত সাইফুলকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে বিষয়টিকে একটি ভিন্ন মোড় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের ভূমিকা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো সাইফুলের আইনি অবস্থান। জানা গিয়েছে, সাইফুল ইতিমধ্যে দুটি মামলায় জামিনপ্রাপ্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও ছাত্রদলের রাজনৈতিক চাপের মুখে পুলিশ তাকে পুনরায় আটক দেখিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা এবং অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়া পুলিশের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মব কালচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
বরুড়ার এই ঘটনাটি একক কোনো ঘটনা নয়।
এটি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব কালচার’ বা সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি অংশ।
১. রাজনৈতিক প্রশ্রয়: ছাত্রদলের মতো অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নাম জড়িয়ে পড়ার অর্থ হলো স্থানীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
২. মানবাধিকার লঙ্ঘন: মধ্যরাতে বাসা থেকে অপহরণ এবং চাঁদা না পেয়ে নির্যাতন করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
৩. প্রশাসনের অসহায়ত্ব: রাজনৈতিক নেতাদের চাপে পুলিশ যখন অন্যায়ভাবে কাউকে আটক করে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে আইনের শাসন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বিচারের অপেক্ষায় এলাকাবাসী
সাইফুল ইসলামের ওপর চালানো এই নির্যাতনের ঘটনায় বরুড়া উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী এবং ভুক্তভোগীর পরিবার এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী সাদ্দামসহ জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করা এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বরুড়ার এই ঘটনাটি তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সাইফুলরা কি তবে নিজ ঘরেও নিরাপদ নন?
