সারাদেশে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দ্বন্দ্ব, মনোনয়ন বাতিল ও একতরফা ভোট নিয়ে বিতর্ক।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচন যেভাবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে
দেশজুড়ে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন এবার শুধু পেশাজীবী নেতৃত্ব বাছাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রাজনৈতিক প্রভাব, মনোনয়ন বাতিল এবং বিরোধী পক্ষকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার অভিযোগে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে শুরু করে Supreme Court Bar Association পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিভাজন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৮৪টি আইনজীবী সমিতির মধ্যে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪১টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিতে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা অংশ নিয়েছেন। এসব নির্বাচনের নয়টিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে জয়লাভ করেছেন। অন্য জেলাগুলোতেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামীপন্থি প্রার্থীরা।
তবে ১৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। ওই নির্বাচনে ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা জয় পান। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে।
১৬ এপ্রিলের পর নির্বাচনের চিত্র
পিরোজপুর নির্বাচনের পর ২৬টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টিতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জয়লাভ করেছেন। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ১০টি জেলা আইনজীবী সমিতিতে বিএনপিপন্থি প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব জেলায় বিএনপিপন্থিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিজয়ী হন।
অন্যদিকে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় জামায়াতপন্থি আইনজীবীরাও একাধিক পদে জয় পেয়েছেন। এতে আইনজীবী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা বার নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত Dhaka Bar Association নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের অংশ নিতে না দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত অ্যাডহক কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন একটি সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে বলা হয়, বারের সভাপতির অনুমতি ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তের ফলে আওয়ামীপন্থি ১৬ জন আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
এর ফল হিসেবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জয়লাভ করেন। একটি পদে জয় পান জামায়াতপন্থি প্রার্থী।
সমালোচকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া পেশাজীবী সংগঠনের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনেও একই পরিস্থিতি
আগামী ১৩ ও ১৪ মে দুই দিনব্যাপী Supreme Court Bar Association নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এই নির্বাচন ঘিরেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অ্যাডহক কমিটি বিশেষ সাধারণ সভা করে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এর মাধ্যমে ৪২ জন আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু এই সিদ্ধান্তকে ‘কলঙ্কজনক’ আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আইনজীবীরা এমন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না।
অন্যদিকে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, সারাদেশে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট বারেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে।
তার দাবি, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারার কারণেই আওয়ামীপন্থিরা বারের নির্বাচনেও সুযোগ পাচ্ছেন না।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসান তারিক চৌধুরী বলেন,
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন নির্বাচন প্রত্যাশা করলেও বাস্তবে সংবিধান লঙ্ঘনের মাধ্যমে অনেক যোগ্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
জেলা পর্যায়ে আওয়ামীপন্থিদের সাফল্য
সব জায়গায় আওয়ামীপন্থিরা ব্যর্থ হননি। মাদারীপুর, সিলেট, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও পিরোজপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন।
মাদারীপুরে ১৫টি পদের মধ্যে ১৩টিতে আওয়ামীপন্থিরা জয়পান। সিলেটে সাধারণ সম্পাদকসহ ১০টি পদে এবং নোয়াখালীতে নয়টি পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচিত হন।
কক্সবাজারেও আওয়ামীপন্থিরা সাতটি পদে জয় পান। সেখানে বিএনপি ও জামায়াতপন্থিরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদে বিজয়ী হয়েছেন।
বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রভাব
খুলনা, শেরপুর, ঝালকাঠি, নড়াইল, রাজশাহী, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
রাজশাহীতে ২১টির মধ্যে ২০টি পদে বিএনপিপন্থিরা জয়লাভ করেন। ফেনীতে বিএনপিপন্থিরা ১০টি এবং জামায়াতপন্থিরা চারটি পদে বিজয়ী হন।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনজীবী সমিতির নির্বাচন এখন দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
আইনজীবী সমিতি মূলত পেশাজীবীদের সংগঠন হলেও বর্তমানে সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এবং একতরফা ভোট আয়োজনের অভিযোগ পেশাজীবী মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনজীবী সমিতির মতো প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
