নিজস্ব নিরাপত্তা দল নিয়ে ঢাকায় মহসিন নকভি। রেডিসনে আইএসআই-ডিজিএফআই বৈঠক ও চিকেন’স নেক নিয়ে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক রহস্যময় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কোনো প্রথাগত ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টার সফরে ঢাকায় পা রেখেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রেজা নকভি। তবে এই সফরটি সাধারণ আর দশটি কূটনৈতিক সফরের মতো নয়। সাধারণত কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগতিক দেশ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করলেও, নকভি এসেছেন তার নিজস্ব বিশাল এক নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ভিনদেশী মন্ত্রীর নিজস্ব সশস্ত্র প্রহরা নিয়ে আসা কেবল বিরলই নয়, বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন তুলেছে।
কেন এই ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়’? নকভির সফরের নেপথ্যে কী?
সৈয়দ মহসিন নকভির এই সংক্ষিপ্ত ও ঝটিকা সফর নিয়ে শুরু থেকেই এক ধরণের গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে,
বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান এখানে তাদের প্রভাব বলয় নতুন করে সাজাতে চাইছে।
সফরের রহস্যজনক দিকগুলো:
- নিজস্ব নিরাপত্তা দল: পাকিস্তানের মতো একটি দেশ—যাকে আন্তর্জাতিক মহলে অনেক সময় ‘সন্ত্রাসবাদের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়—সেই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন ঢাকায় নিজস্ব কমান্ডো নিয়ে এলেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
- ২৪ ঘণ্টার মিশন: এতো স্বল্প সময়ের জন্য কেন এই সফর এবং এর পেছনে কোন জরুরি এজেন্ডা কাজ করছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রেডিশন ব্লু-র সেই গোপন বৈঠক: টার্গেট যখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি পাওয়া গেছে ঢাকার অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি,
সেখানে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং বাংলাদেশের ডিজিএফআই (DGFI) ও এনএসআই (NSI)-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকের সম্ভাব্য এজেন্ডা:
১. গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা এবং আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান।
২. চিকেন’স নেক (Chicken’s Neck): শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’—যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে—সেই কৌশলগত পয়েন্টে অস্থিরতা তৈরির ছক।
৩. ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেট: বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদ বা ‘এজেন্ট’দের পুনর্গঠন এবং তাদের প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগানো।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রহরায় কী আনা হয়েছে?
নকভির নিজস্ব নিরাপত্তা দলের সাথে বিশাল আকারের বেশ কিছু বাক্স এবং সরঞ্জাম ঢাকায় নামানো হয়েছে বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে।
প্রশ্ন উঠছে,
এই বিশেষ প্রহরার আড়ালে কি কোনো অত্যাধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম বা এমন কোনো উপকরণ আনা হয়েছে,
যা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার নামে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে?
ভারতের পিঠে ‘কূটনৈতিক ছুরি’ মারার যে নতুন সমীকরণ এই অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে, নকভির সফর কি তারই চূড়ান্ত মহড়া?
বাংলাদেশ নিয়ে নতুন কি ষড়যন্ত্র?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন,
তারেক রহমানের পাকিস্তান-তুরস্ক লবির দিকে ঝুঁকে পড়ার সিদ্ধান্তের পর এই ধরণের সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার ‘কৌশলগত সমঝোতা’র (Strategic Truce) সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান এখন বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি ‘লজিস্টিক বেস’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
- বিপর্যস্ত কূটনীতি: ভারতের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সাথে বাংলাদেশের এই মাখামাখি দীর্ঘমেয়াদে এদেশকে একটি ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে।
- জ্বালানি ও অস্ত্র চোরাচালান: এই অঞ্চলের ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের কালোবাজারকে চাঙ্গা করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই সমন্বয় কি কোনো নতুন বিপদের ইঙ্গিত?
জবাব খুঁজে বের করার সময় এখনই
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রহস্যময় সফর এবং রেডিসনের গোপন বৈঠক কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়;
এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
নিজস্ব নিরাপত্তা দল নিয়ে এসে নকভি কি এটাই প্রমাণ করলেন যে বাংলাদেশের ওপর তাদের আস্থা নেই? নাকি এই প্রহরার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ভয়ঙ্কর নীল নকশা? বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন এই ‘ষড়যন্ত্রের’ গভীরে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর।
