জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলায় মৃত দেখানো জীবিত ব্যক্তিকে! সড়ক দুর্ঘটনাকে সাজানো হয়েছে গুলিবিদ্ধ নাটক। পিবিআই-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ভয়ংকর সব জালিয়াতির তথ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে পুঁজি করে একদল সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠী ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে বিচার ব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া শত শত মামলায় এখন দেখা দিচ্ছে ভয়ংকর সব অসংগতি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের সাম্প্রতিক তদন্তে এমন কিছু তথ্য পেয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার নৈতিক ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। তদন্তে দেখা গেছে, জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ সাজানো কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার চোটকে ‘গুলির আঘাত’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর এক মহোৎসব চলছে।
ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার ‘মরণ কামড়’: মৃত নয়, জীবিত কাওসার!
সবচেয়ে নাটকীয় জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর উত্তরা এলাকায়।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর পারুল খাতুন নামক এক নারী আদালতে অভিযোগ করেন যে, ১৮ জুলাই উত্তরা আজমপুর এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে গিয়ে তার ছেলে মো. কাওসার মিয়া পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
শুধু তাই নয়, দাবি করা হয় যে ছেলের মরদেহটিও খুঁজে পাননি তিনি। এই আবেগঘন আর্তি কাজে লাগিয়ে ২৫৭ জন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
পিবিআই-এর গোয়েন্দা নজরদারিতে উঠে আসা সত্য: তদন্তকারী সংস্থা যখন লাশের খোঁজে নামে, তখন তারা দেখতে পায় ‘নিহত’ কাওসার আসলে কোথাও মারা যাননি।
তিনি দিব্যি সুস্থ শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি চলতি বছরের ২ জুন একটি ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় তাকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছিল।
অর্থাৎ, যাকে কবর দেওয়ার জন্য মা বিলাপ করছিলেন, তিনি আসলে পুলিশের হাজতে জীবিত অবস্থায় সময় পার করছিলেন।
কেন একজন মা তার জীবিত সন্তানকে মৃত ঘোষণা করে আড়াই শতাধিক মানুষকে আসামি করলেন, সেই রহস্য এখন ঘনীভূত হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘গুলিবিদ্ধ’ নাটক: সিলেটের চাঞ্চল্যকর কাহিনী
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে শিহাব নামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা ফাতেমা আক্তার পারুল গত ২১ নভেম্বর একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন।
সেখানে দাবি করা হয়, ৪ আগস্ট উপজেলা পরিষদের সামনে আসামিদের ককটেল ও গুলিতে শিহাব মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে।
এতে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
তদন্তে যা মিলল: পিবিআই-এর তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ আগস্ট শিহাব ওই এলাকায় উপস্থিতই ছিল না।
প্রকৃতপক্ষে, সে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে মোটরসাইকেল সংঘর্ষে আহত হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল ও বিজিবি হাসপাতালের চিকিৎসকদের দেওয়া ছাড়পত্রেও কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্থানীয় দুই গ্রুপের রাজনৈতিক রেষারেষির বলি হয়েই এই মিথ্যা মামলাটি সাজানো হয়েছিল।
পরিসংখ্যানে মামলার ভয়াবহ চিত্র: আসামি ৬ হাজার, সত্যতা মাত্র কয়েকশ’তে
পিবিআই সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে ১৯৫টি সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলার তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। এর মধ্যে ১১৩টি মামলার তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
পুরোপুরি ভুয়া মামলা: তদন্তে এখন পর্যন্ত ১৪টি মামলাকে ১০০% সাজানো বা ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রমাণের অভাব: আরও ১০টি মামলায় অভিযোগের সপক্ষে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা।
নির্বিচার আসামি: তদন্তাধীন ৮৯টি মামলায় মোট ৬ হাজার ৮৪৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
অথচ গভীর তদন্ত শেষে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের সাথে অপরাধের কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই।
মাত্র ১ হাজার ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।
পিবিআই ও পুলিশের ভাষ্য: আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর হুঁশিয়ারি
পিবিআই-এর পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মো. আবু ইউসুফ জানান, তারা অত্যন্ত পেশাদারত্বের সাথে মামলাগুলো যাচাই করছেন।
অকারণে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “যেসব মামলায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে, আমরা আদালতে সেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিচ্ছি যাতে আসামিরা অব্যাহতি পান।”
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম) খন্দকার রফিকুল ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যারা মিথ্যা মামলা করে বিচার বিভাগকে বিভ্রান্ত করছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারা মোতাবেক মিথ্যা মামলাকারীদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ: বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এই প্রবণতাকে বিচারব্যবস্থার জন্য ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি মনে করেন, ৫ আগস্টের পর একদল মানুষ ব্যক্তিগত ক্রোধ মেটাতে আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
“যাদের ঘটনার সাথে দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের যখন খুনের মামলায় আসামি করা হয়, তখন প্রকৃত বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এটি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের প্রতিও এক ধরনের চরম অবমাননা।” — নূর খান লিটন
কেন এই জালিয়াতি? নেপথ্যের কারণসমূহ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গণ-মামলার নেপথ্যে তিনটি প্রধান বিষয় কাজ করছে:
১. রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান: প্রতিপক্ষ দলকে এলাকাছাড়া করতে পাইকারি হারে মামলা দেওয়া।
২. চাঁদাবাজি ও হয়রানি: নাম কাটিয়ে দেওয়ার নাম করে আসামি ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
৩. পারিবারিক ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ: পুরোনো ব্যক্তিগত শত্রুতাকে ‘আন্দোলনে হামলা’র মোড়ক দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের আবেগের জায়গা। কিন্তু এই আবেগকে পুঁজি করে যদি ‘মৃত’ সাজিয়ে বা ‘দুর্ঘটনা’কে জখম দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলনের গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত প্রতিটি মামলার খুঁটিনাটি যাচাই করে প্রকৃত দোষীদের কাঠগড়ায় তোলা এবং মিথ্যা মামলার মাস্টারমাইন্ডদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
