GSOMIA ও ACSA চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ- খুলছে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর। বেইজিংয়ের জন্য বড় ধাক্কা?
দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক মহা-পরিবর্তনের ঘণ্টা বাজছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার পর, বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ঐতিহাসিক ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার কৌশলগত সমুদ্রবন্দর এবং বিমানঘাঁটিগুলোর অবকাঠামো মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। এই পদক্ষেপ বঙ্গোপসাগরে শক্তির ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
ইউএসটিআর (USTR) সফর এবং ট্রাম্পের গোপন চিঠি
চলতি মাসের ৫ থেকে ৭ মে, ২০২৬ তারিখে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (USTR) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে।
এই সফরে মূলত দুই দেশের মধ্যে ইতিপূর্বে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (ART)
–এর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও নেপথ্যে ছিল এক বড় সামরিক সমীকরণ।
কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়েছেন।
ওই চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে,
মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে হলে ঢাকাকে দুটি সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। চুক্তি দুটি হলো:
১. GSOMIA (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট): এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ-পর্যায়ের সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।
২. ACSA (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট): এই চুক্তির আওতায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানগুলো বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও বিমানঘাঁটিতে প্রবেশ, জ্বালানি সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক সাপোর্ট পাওয়ার অধিকার লাভ করবে।
চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ি : পেন্টাগনের নতুন কৌশলগত কেন্দ্র
প্রতিরক্ষা চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এবং নবনির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ি মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।
- পুনরায় জ্বালানি সরবরাহ: ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন খুব সহজেই বাংলাদেশের জলসীমায় এসে রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে।
- নজরদারি বৃদ্ধি: মার্কিন সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের রাডার এবং বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় পুরো অঞ্চলের ওপর ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
পোশাক খাতের ১৯% শুল্ক ছাড়: সামরিক সুবিধার আড়ালে অর্থনৈতিক ‘টোপ’
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও রিজার্ভ সংকটের সময়ে বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তিটি এক ধরণের বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত—তৈরি পোশাক শিল্পে মার্কিন বাজারে ১৯ শতাংশ পছন্দসই শুল্কহার (Preferential Tariff)
এবং শুল্কমুক্ত (Duty-Free) সুবিধা বজায় রাখার শর্ত হিসেবে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সামনে এনেছে ওয়াশিংটন।
ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঢাকাকে এই ভূ-politically ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তিটি মেনে নিতে হচ্ছে।
বেইজিংয়ের জন্য বড় ধাক্কা: মিয়ানমার ও সিএমইসি (CMEC) সমীকরণ
বাংলাদেশের এই আকস্মিক কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন চীনের জন্য এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিতে পারে।
চীনা নির্ভরতা: বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ অস্ত্র চীন থেকে আসে এবং দেশের বড় বড় বন্দর অবকাঠামোয় বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে।
মালাক্কা প্রণালী এড়ানোর কৌশল: চীন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ‘মালাক্কা প্রণালী’ এড়াতে মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ বন্দর
এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (CMEC)-এ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
কিন্তু বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি এবং নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় চীনের এই বিকল্প রুটটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে।
দুই পরাশক্তির মাঝে বাংলাদেশ
আমেরিকার যুদ্ধজাহাজের জন্য বন্দর খুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে বিশ্ব রাজনীতির এক জ্বলন্ত চুল্লিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
একদিকে মার্কিন অর্থনৈতিক সুবিধা ও কোয়াড (QUAD) অক্ষের পরোক্ষ চাপ,
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী চীনের ক্ষোভ—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা ইউনূস-তারেক প্রশাসনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।
এই চুক্তি যদি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়,
তবে আগামী দিনে ঢাকার আকাশ ও সমুদ্রসীমায় মার্কিন সামরিক শক্তির গর্জন দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রকে এক নতুন ও জটিল মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে।
