কিশোরগঞ্জের ইটনায় নিখোঁজের ৫ দিন পর আরিক নামের এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের গলায় ইট ও কোমরে বালুর বস্তা বাঁধা ছিল। ঘটনার তদন্ত চলছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত ইটনা উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ পাঁচ দিন পর আরিক মিয়া (১২) নামের এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। শনিবার (১৬ মে) বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত কালিবাড়ি চরের একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় নিহতের শরীরের নৃশংসতার নির্মম ছাপ দেখা গেছে। ঘাতকেরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়ে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে কিশোরের গলায় ভারী ইট এবং কোমরে বালুভর্তি বস্তা বেঁধে পানির নিচে ডুবিয়ে দিয়েছিল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত কিশোরের পরিচয়
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের শিকার আরিক মিয়া পার্শ্ববর্তী জেলা নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বাসিন্দা।
সে ওই উপজেলার পাঁচহাট গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা রেজেক মিয়ার সন্তান।
১২ বছর বয়সী আরিকের এমন মর্মান্তিক পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা।
নিখোঁজের পটভূমি ও পরিবারের আকুতি
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১১ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে আরিক আচমকা তার নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়।
গভীর রাতে শয়নকক্ষ থেকে সে কীভাবে বা কার ডাকে বাইরে বের হয়েছিল, তা পরিবারের কেউ টের পায়নি।
সকাল বেলা তাকে ঘরে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি, পাড়া-মহল্লাসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজেও যখন আরিকের কোনো হদিস মিলছিল না,
তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
নিখোঁজের পরদিনই অর্থাৎ ১২ মে আরিকের বাবা রেজেক মিয়া বাদী হয়ে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ভুক্ত করেন।
প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও শেষ রক্ষা হলো না; পাঁচ দিন পর মিলল সন্তানের নিথর দেহ।
যেভাবে সন্ধান মিলল মরদেহের
শনিবার দুপুরে ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা কালিবাড়ি চরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক গবাদি পশুর জন্য ঘাস কাটতে যান।
চরের ভেতরের একটি নির্জন ডোবার পাশে যাওয়ার পর তারা তীব্র দুর্গন্ধ পান।
কৌতুহলবশত ডোবার দিকে এগোতেই তারা পানির মধ্যে একটি মানবদেহ সদৃশ বস্তু ভাসতে দেখেন।
যুবকদের চিৎকারে আসেপাশের লোকজন ছুটে আসে।
খবরটি দ্রুত লোকমুখে রাষ্ট্র হতে হতে পার্শ্ববর্তী খালিয়াজুড়ি উপজেলাতেও পৌঁছায়।
নিখোঁজ আরিকের স্বজনরা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ডোবায় ভাসমান মরদেহটি নিখোঁজ আরিকের বলে শনাক্ত করেন।
এরপরই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
নৃশংসতার চিত্র: গলায় ইট ও কোমরে বালুর বস্তা
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আরিকের মৃত্যুটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা বা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
হত্যাকারীরা আরিককে শ্বাসরোধ বা অন্য কোনো উপায়ে হত্যা করার পর প্রমাণ লোপাটের সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছিল।
উদ্ধারকালে দেখা যায়, আরিকের নিথর দেহের গলায় ভারী ইট শক্ত করে বাঁধা ছিল।
এছাড়া পানির নিচে যেন লাশটি স্থায়ীভাবে তলিয়ে থাকে, সেজন্য তার কোমরের অংশে একটি বালুভর্তি বস্তা দড়ি দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
স্বজনদের দাবি, আরিকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন এবং ক্ষত রয়েছে, যা প্রমাণ করে মৃত্যুর আগে সে চরম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান
খবর পাওয়ার পরপরই ইটনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেব মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের পর বিকেল ৫টার দিকে ডোবা থেকে মরদেহটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এ বিষয়ে ইটনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেব মিয়া গণমাধ্যমকে জানান,
“কিশোরটি গত ১১ মে নেত্রকোনার নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল এবং এ বিষয়ে খালিয়াজুড়ি থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরিও করা হয়েছিল। আজ (শনিবার) আমাদের ইটনা থানার ধনপুর কালিবাড়ি চর এলাকার একটি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।”
ওসি আরও জানান, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে।
অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আইনগত সমস্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
হাওরাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ ও জননিরাপত্তা
কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার এই সীমান্ত দূরবর্তী হাওর এলাকাগুলো ভৌগোলিক কারণেই অত্যন্ত দুর্গম।
বিশেষ করে বর্ষার প্রাক্কালে বা শুকনা মৌসুমে এই বিশাল চরাঞ্চলগুলো অপরাধীদের জন্য সেফ জোন বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
জনবসতি কম এবং যাতায়াত ব্যবস্থা তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় অপরাধ সংঘটন করে পার পেয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা অপরাধী চক্রের মধ্যে থাকে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চরাঞ্চলে পুলিশি টহল বা নজরদারি কম থাকার কারণে এই ধরনের অপরাধ দিন দিন বাড়ছে।
আরিকের মতো একটি ১২ বছরের নিস্পাপ শিশুর এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো অঞ্চলের মানুষের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিবারের আহাজারি ও বিচারপ্রার্থনা
পাঁচহাট গ্রামে আরিকের বাড়িতে এখন চলছে মাতম। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আরিকের পিতা রেজেক মিয়া অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “আমার ছেলে তো কোনো অপরাধ করেনি, কারোর সাথে আমাদের কোনো শত্রুতাও নেই। তাহলে কেন আমার নিষ্পাপ সন্তানকে এভাবে কসাইয়ের মতো হত্যা করা হলো? আমি সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে আমার বুক খালি করা খুনিদের ফাঁসি চাই।”
গ্রামের প্রতিবেশীরাও এই ঘটনায় স্তব্ধ। তারা বলছেন, আরিক অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। এলাকার কোনো ঝগড়া-বিবাদের সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাকে চক্রান্ত করে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বা অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা।
তদন্তের গতিপ্রকৃতি: জোড়া থানার সমন্বয়
যেহেতু ঘটনাটির সূত্রপাত নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি থানায় (যেখান থেকে কিশোর নিখোঁজ হয়েছিল) এবং মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কিশোরগঞ্জের ইটনা থানা এলাকায়, তাই এই মামলার তদন্তে দুই জেলার পুলিশের মধ্যেই এক ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিমধ্যেই খালিয়াজুড়ি থানা পুলিশও নিখোঁজের ডায়েরির সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেছে। আরিক নিখোঁজ হওয়ার রাতে তার মোবাইল ফোনে কোনো কল এসেছিল কিনা, বা শেষ সময়ে তাকে কার কার সাথে দেখা গেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধীদের অবস্থান ও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
একটি ১২ বছরের শিশুর এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনো সুস্থ সমাজের চাদরে ঢাকা পড়তে পারে না। আরিক হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের গডফাদার বা প্রত্যক্ষ খুনিদের অতি দ্রুত গ্রেফতার করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশি প্রশাসন যদি দ্রুত এই ঘটনার কূল-কিনারা করতে পারে, তবেই হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তার বিশ্বাস ফিরে আসবে। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—খুনিদের যেন দ্রুততম সময়ে আইনের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
