সিলেটের গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে নাতনিকে অপহরণের চেষ্টা। বাধা দেওয়ায় ছুরিকাঘাতে দাদি দিলারা বেগম খুন, আহত মা-মেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট, ১৬ মে, ২০২৬ সিলেটের গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে এক লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘরে ঢুকে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী নাতনিকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টাকালে বাধা দেওয়ায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন তার দাদি। এই নৃশংস হামলায় গুরুতর জখম হয়েছেন ওই কিশোরী এবং তার মা-ও। বর্তমানে তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার রুস্তুমপুর ইউনিয়নের বীরমঙ্গল হাওর গ্রামে। নিহত নারীর নাম দিলারা বেগম (৫৪)। তিনি ওই এলাকার প্রয়াত মাহমুদ হোসেনের স্ত্রী। এই ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।
গভীর রাতের বিভীষিকা: যেভাবে ঘটল এই নৃশংসতা
স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে যখন পুরো গ্রাম গভীর ঘুমে মগ্ন,
ঠিক তখন বীরমঙ্গল হাওর গ্রামের এক অসহায় পরিবারে নেমে আসে এই নারকীয় তাণ্ডব।
একটি সাধারণ টিনের ঘরে দিলারা বেগম তার প্রতিবন্ধী মেয়ে, এক প্রতিবন্ধী নাতি, পুত্রবধূ ও নাতনিকে নিয়ে বসবাস করতেন।
পরিবারের উপার্জনক্ষম দুই ছেলে মাত্র কয়েক মাস আগে জীবিকার তাগিদে বিপুল পরিমাণ ঋণ মাথায় নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন।
পুরুষশূন্য এই বাড়িতে গভীর রাতে তিন অজ্ঞাত পরিচয় যুবক ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
দুর্বৃত্তরা সরাসরি সেই কক্ষে হানা দেয়, যেখানে ১৪ বছর বয়সী ওই কিশোরী তার মায়ের সাথে ঘুমিয়ে ছিল।
ঘরে ঢুকেই তারা কিশোরীর মুখ চেপে ধরে এবং তাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
মা ও মেয়ের ওপর বর্বর হামলা
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে কিশোরীর মা সাজনা বেগম দেখতে পান, বজ্রপাতের আলোয় এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তার মেয়ের ওপর চড়াও হয়েছে এবং তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
মাতৃত্বের টানে তিনি তৎক্ষণাৎ বাধা দিলে দুর্বৃত্তরা হিংস্র হয়ে ওঠে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে এক হামলাকারী সাজনা বেগমের হাতে সজোরে কামড় দেয়।
মায়ের প্রতিরোধ দেখে অন্য এক দুর্বৃত্ত ধারালো ছুরি বের করে কিশোরীকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে এবং তার হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে।
মা ও মেয়ের এই মরণপণ চিৎকার ও আর্তনাদে পুরো ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
নাতনিকে বাঁচাতে গিয়ে দাদির আত্মত্যাগ
পাশের কক্ষ থেকে মা-মেয়ের এই গোঙানি ও বাঁচার আকুতি শুনতে পান দাদি দিলারা বেগম।
তিনি কালবিলম্ব না করে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। দুর্বৃত্তরা যখন কিশোরীকে টেনে দরজার বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ৫৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা সাহসিকতার সাথে দরজার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ান।
তিনি চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকার চেষ্টা করেন।
নিজের অবর্তমানে নাতনির কী ভয়ানক পরিণতি হতে পারে, তা ভেবে তিনি পথ আগলে রাখলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দুর্বৃত্তরা।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঘাতক তার হাতের ধারালো ছুরি দিয়ে দিলারা বেগমের বুকের ডান পাশে সজোরে আঘাত করে।
ছুরির আঘাতে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যেই দরজার চৌকাঠে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বৃদ্ধার রক্তাক্ত নিথর দেহ মাটিতে পড়ে যেতে দেখে ঘাতকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং কিশোরীকে ফেলে রেখে দ্রুত অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়।
প্রতিবেশীদের জবানবন্দি ও রক্তাক্ত দৃশ্য
গভীর রাতে টিনের ঘরটি থেকে ভেসে আসা গোঙানি ও কান্নাকাটির শব্দ শুনে ছুটে আসেন প্রতিবেশী আলকাছ মিয়াসহ আশেপাশের কয়েকজন বাসিন্দা।
আলকাছ মিয়া জানান:
“রাত তখন আনুমানিক তিনটা। হঠাৎ করেই পাশের বাড়ি থেকে বিকট কান্নাকাটি ও বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতে পাই। আমরা কয়েকজন টর্চলাইট নিয়ে দ্রুত ওই বাড়িতে ছুটে যাই। ভেতরে ঢুকে যা দেখলাম, তা কোনোদিন ভোলার নয়। ঘরের দরজার মুখে দিলারা বেগম রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছেন। আর ঘরের অন্য এক কোণায় জখম ও রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছিলেন কিশোরী ও তার মা সাজনা বেগম। পুরো ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।”
ততক্ষণে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীরা আহত মা ও মেয়েকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।
বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মায়ের চোখে সেই রাতের ভয়ঙ্কর বিবরণ
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরানো মা সাজনা বেগম সেই রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে উঠছিলেন।
তিনি বলেন, “রাতের বেলা হঠাৎ একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়।
চোখ মেলেই দেখি ঘরের দরজা খোলা এবং মেঘের ডাকের সাথে সাথে যে বিজলি চমকাচ্ছিল, সেই আলোয় দেখতে পাই একটা লোক আমার মেয়ের ওপর চড়াও হয়েছে।
আমি চিৎকার করে তাকে জড়িয়ে ধরলে লোকটা আমার হাতে কামড়ে দেয় এবং আমার মেয়েকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে।
আমাদের চিৎকার শুনে আম্মা (শাশুড়ি) পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসেন। তিনি দরজায় দাঁড়াতেই লোকগুলো উনার বুকে ছুরি বসিয়ে দিল। আমার চোখের সামনেই আম্মা মারা গেলেন।”
শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কিশোরী
নিহতের এক নিকটাত্মীয় জানিয়েছেন, এই লোমহর্ষক ঘটনা পুরো এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ওই কিশোরী চোখের সামনে নিজের দাদিকে খুন হতে দেখেছে এবং নিজে মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এই দ্বৈত ট্রমার কারণে সে মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালে সে বারবার আতঙ্কে শিউরে উঠছে।
পরিবারের পুরুষ সদস্যরা প্রবাসে থাকায় এই মুহূর্তে পুরো পরিবারটি সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ও চরম নিরাপত্তারাহীনতায় ভুগছে।
পুলিশের তৎপরতা: কী ছিল মূল উদ্দেশ্য?
শনিবার (১৬ মে) সকাল ১০টার দিকে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ খবর পেয়ে উপপরিদর্শক (এসআই) হাফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে বীরমঙ্গল হাওর গ্রামে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে দিলারা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।
ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
স্থানীয়রা এটিকে ধর্ষণ বা অপহরণের চেষ্টা বলে মনে করলেও পুলিশের তদন্তে অন্য একটি দিক উঠে এসেছে।
ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান:
টাকার বিরোধ: প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহতের এক প্রবাসী সন্তানের সাথে কিছু লোকের আর্থিক লেনদেন বা টাকা-পয়সা নিয়ে পূর্বশত্রুতা ছিল।
মূল উদ্দেশ্য: পুলিশ ধারণা করছে, ধর্ষণের উদ্দেশ্যে নয়, বরং পূর্বশত্রুতা ও আর্থিক বিরোধের জেরে পরিবারটিকে পাঠ শেখাতে বা জিম্মি করতে কিশোরীকে অপহরণের এই ছক কষা হয়েছিল।
অপরাধী শনাক্তকরণ: পুলিশ ইতিমধ্যেই এই বর্বরোচিত ঘটনার সাথে জড়িত দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করার সুবিধার্থে এই মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দাবি ও বর্তমান পরিস্থিতি
শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের একাধিক টিম আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে বলে থানা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে, একজন নিরীহ প্রবাসীর বৃদ্ধা মাকে হত্যা এবং মা-মেয়ের ওপর এই নৃশংস হামলার ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও বীরমঙ্গল হাওর গ্রামের বাসিন্দারা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রবাসীদের পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান। একটি অসহায় ও প্রতিবন্ধী সদস্যবহুল পরিবারের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবি উঠেছে স্থানীয় সর্বস্তর থেকে।
