রাজধানীর মুগদায় পলিথিনে মোড়ানো অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মাথাবিহীন লাশের ৭টি খণ্ড উদ্ধার করেছে পুলিশ। এলাকায় চরম আতঙ্ক। ঘটনার বিস্তারিত ও তদন্তের আপডেট জানুন।
ঢাকা, ১৭ মে ২০২৬: রাজধানীর মুগদা থানা এলাকার মান্ডায় এক গা শিউরে ওঠা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। একটি বহুতল ভবনের নিচে পলিথিন ব্যাগে বন্দি অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির মাথাবিহীন দেহের সাতটি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে মরদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মাথা’ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এই চরম নৃশংসতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা মান্ডা এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক আলামত ও লাশের অবস্থা দেখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, এটি কোনো পরিকল্পিত এবং চরম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। খুনিরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই অপরাধ সংঘটিত করেছে।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো এই নৃশংস ঘটনা
রোববার (১৭ মে) বিকেলে মুগদার মান্ডা এলাকার আব্দুল গনি রোডের ‘শাহনাজ ভিলা’ নামের একটি বাড়ির সামনে স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র দুর্গন্ধ পেতে শুরু করেন।
প্রথমে সাধারণ বর্জ্যের গন্ধ মনে করলেও সময়ের সাথে সাথে দুর্গন্ধটি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
সন্দেহ দানা বাঁধলে স্থানীয় কয়েকজন যুবক দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা ভবনের বেইসমেন্টের নিচের একটি পরিত্যক্ত কোণে কয়েকটি কালো পলিথিন ব্যাগ দেখতে পান।
ব্যাগের ভেতর থেকে রক্তাক্ত ও গলিত মাংসপিণ্ড উঁকি দিতে দেখে তারা নিশ্চিত হন যে ভেতরে কোনো মানুষের লাশ রয়েছে।
এরপরই এলাকাবাসী আতঙ্কিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মুগদা থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন।
পুলিশের অভিযান ও পলিথিন বন্দি ৭ খণ্ড
খবর পাওয়ার পরপরই মুগদা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু রায়হানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশ পুরো এলাকাটি কর্ডন বা ঘিরে ফেলে এবং উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দেয়।
পুলিশের তদন্ত দল বেইসমেন্টের নিচ থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় সেই মরদেহটি উদ্ধার করে। ব্যাগগুলো খোলার পর সেখানে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হাত, পা ও ধড়সহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মোট সাতটি টুকরো করে আলাদা আলাদা পলিথিনে প্যাক করা ছিল।
তবে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পুলিশ ওই ব্যক্তির মাথার কোনো সন্ধান পায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য: কী বলছে পুলিশ?
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মুগদা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু রায়হান গণমাধ্যমকে জানান:
“স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমরা দ্রুত মান্ডা আব্দুল গনি রোডের শাহনাজ ভিলার সামনে যাই। ভবনের নিচের অংশ থেকে আমরা একটি অজ্ঞাতনামা পুরুষের মরদেহের সাতটি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছি। মরদেহটি পুরোপুরি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল, যা দেখে মনে হচ্ছে হত্যাকাণ্ডটি আরও দু-তিন দিন আগে ঘটানো হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “লাশটির মাথা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মাথা না পাওয়ায় এবং শরীর বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের নাম বা পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।”
হত্যাকাণ্ডের ধরন: পেশাদার খুনিদের কাজ?
পুলিশ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, এটি কোনো সাধারণ ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ঘটানো খুন নয়।
অপরাধীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।
সাধারণত পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে এবং লাশ সহজে গুম করার জন্য খুনিরা দেহকে এভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করে থাকে।
মাথাটি অন্য কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে যাতে নিহতের ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা দেখে কেউ চিনতে না পারে।
লাশের টুকরোগুলো যেভাবে পলিথিনে মুড়িয়ে জনাকীর্ণ এলাকার একটি বেইসমেন্টে ফেলে যাওয়া হয়েছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে খুনিরা এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত।
ময়নাতদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া
ঘটনাস্থলে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ করে পুলিশ খণ্ডিত দেহাংশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর সঠিক সময় এবং হত্যার নিখুঁত কারণ জানা সম্ভব হবে।
এছাড়া নিহতের ডিএনএ (DNA) নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে, যাতে পরবর্তীতে কেউ দাবিদার এলে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ
রাজধানীর বুকে এমন নৃশংস টুকরো টুকরো লাশের ঘটনা নতুন করে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। মান্ডা আব্দুল গনি রোডের বাসিন্দারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শাহনাজ ভিলার এক প্রতিবেশী জানান, “দিনের আলোয় বা রাতের আঁধারে কে বা কারা এসে এত বড় একটা অপরাধ করে গেল, আমরা টেরই পেলাম না।
এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই ভয় হচ্ছে।”
স্থানীয়রা এই ঘটনার পেছনে থাকা মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পরিচয় শনাক্ত ও রহস্য উদ্ঘাটনে প্রযুক্তির ব্যবহার
পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই (ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এবং সিআইডি-র ক্রাইম সিন ইউনিট এই ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।
নিহতের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ডেটাবেজের সাথে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে লাশ অর্ধগলিত হওয়ায় আঙুলের ছাপ কতটা নিখুঁতভাবে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে।
এছাড়াও শাহনাজ ভিলা এবং আব্দুল গনি রোডের প্রবেশ ও বাহির পথের গত কয়েকদিনের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
কারা পলিথিন ব্যাগ হাতে ওই ভবনের দিকে গিয়েছিল, তা শনাক্ত করতে পারলেই এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মুগদার এই মাথাবিহীন লাশের সাত টুকরো উদ্ধারের ঘটনাটি অপরাধ জগতের এক অন্ধকার দিককে আবারও সামনে এনে দিল।
নিহতের আসল পরিচয় কী? কেন তাকে এত নির্মমভাবে মরতে হলো? আর তার মাথাই বা কোথায়? — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে এখন কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
