ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনায় তদন্তে উঠে আসছে উসকানিদাতা, সংগঠক ও অর্থদাতাদের নাম। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে—কারা এসব হামলার নেপথ্যে ছিল এবং কেন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো।
ছায়ানটে হামলা: পরিকল্পিত নাকি আকস্মিক?
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ধানমণ্ডির ছায়ানট ভবনে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক শ ব্যক্তি মুখ ঢেকে ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলাকারীদের অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র ছিল। পরে ভবনের সামনে অগ্নিসংযোগও করা হয়।
ছায়ানটের দায়ের করা মামলায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলায় প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উদীচীতে অগ্নিসন্ত্রাস
ছায়ানট হামলার পরদিন ১৯ ডিসেম্বর হামলার শিকার হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক দেশীয় অস্ত্র হাতে ভবনে ঢুকে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্যেই এই হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্তে যা জানা গেছে
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা একই চক্রের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড হতে পারে। তদন্তে ইতোমধ্যে কয়েকজন হামলাকারী শনাক্ত হয়েছেন এবং অন্তত একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক উসকানি ও অপপ্রচার চালানো হয়েছিল।
তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে—কারা অনলাইনে উসকানি দিয়েছে, কারা অর্থায়ন করেছে এবং কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত ছিল কিনা।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভয় ও উদ্বেগ
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, এসব হামলা শুধু ভবন বা সম্পত্তির ওপর আক্রমণ নয়; বরং দেশের অসাম্প্রদায়িক ,প্রগতিশীল চেতনাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করেছে।
তাই এই অঙ্গনকে দুর্বল করার চেষ্টা সমাজের প্রগতিশীল ধারার ওপরও আঘাত।
অন্যদিকে সাংবাদিক নুরুল কবির দাবি করেন, হামলার আগে থেকেই প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে,
এসব হুমকি উপেক্ষা করায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন,
মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর আঘাত এসেছিল, বর্তমান হামলাগুলোও সেই ধারারই অংশ বলে মনে হচ্ছে।
কারা জড়িত—এখনো স্পষ্ট নয়
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও নেপথ্যের সমন্বয়কারী ও অর্থদাতাদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক, উগ্রবাদী কিংবা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও তদন্তাধীন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরো বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
