সংসদ ভবন ও সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার ওড়ানোর হুমকিদাতা মাকতাবাহ আল হিম্মাহর মাস্টারমাইন্ড মাহেদ গ্রেপ্তার। দুর্গম পাহাড়ে ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান।
জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার উড়িয়ে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া এক বিপজ্জনক উগ্রবাদীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে এই ভয়াবহ হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। উগ্রপন্থী এই যুবকের কাছ থেকে একটি রহস্যময় পেনড্রাইভসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও আলামত জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে বড় ধরনের নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের এক বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া এই ২৩ বছর বয়সী যুবকের নাম মো. রাহেদ হোসেন মাহেদ। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন চাকরিচ্যুত সদস্য। গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা থানা এলাকার এক দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত অঞ্চলে টানা ১২ ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়।
অপারেশন বোবারথল: বৃষ্টি ও জঙ্গল পেরিয়ে রুদ্ধশ্বাস অভিযান
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ ও ঢাকার কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিট যৌথভাবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
- দুর্গম টিলায় আস্তানা: মৌলভীবাজারের বড়লেখা থানার অন্তর্গত বোবারথল ষাইটঘরি এলাকার একটি জঙ্গলঘেরা এবং খাড়া টিলায় আত্মগোপন করেছিলেন এই পরিকল্পনাকারী।
- ১২ ঘণ্টার লড়াই: আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত বৈরী। একদিকে অবিরাম বৃষ্টি, অন্যদিকে ঘন জঙ্গল ও দুর্গম পাহাড়। এই সমস্ত প্রতিকূলতা মাড়িয়ে রাতভর এবং দিনভর টানা ১২ ঘণ্টা ধরে চিরুনি অভিযান চালানো হয়।
- চূড়ান্ত পতন: দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর গত বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে ওই টিলার ওপর থেকে তাকে কর্ডন করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় যৌথ বাহিনী।
কে এই মাহেদ? উগ্রবাদের অন্ধকার জগতে সাবেক সেনা সদস্য
পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া এই ২৩ বছর বয়সী তরুণ উগ্রবাদীর নাম মো. রাহেদ হোসেন মাহেদ।
তার আদি বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর এলাকায়।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, মাহেদ সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০২৩ সালে ছুটিতে আসার পর তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে যাননি। ফলশ্রুতিতে, সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইন ও বিধিমালা (Rules and Regulations) অনুযায়ী তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
একজন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি উগ্রবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে এই ধরণের নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
কারণ, সাধারণ জঙ্গিদের তুলনায় একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির কৌশলগত আক্রমণ করার ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে।
টার্গেট ছিল রাষ্ট্রীয় হৃদপিণ্ড: কী ছিল সেই হুমকিতে?
গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদরদপ্তর থেকে দেশব্যাপী একটি উচ্চ-পর্যায়ের নিরাপত্তা সতর্কতা বা ‘অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছিল। সেই সতর্কবার্তার নেপথ্যে ছিল এই মাহেদের দেওয়া কিছু ভয়ঙ্কর হুমকি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মাহেদের প্রধান টার্গেটগুলোর মধ্যে ছিল:
১. জাতীয় সংসদ ভবন: দেশের আইনসভার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
২. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO): রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতার শীর্ষ কেন্দ্র।
৩. নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনা: বিভিন্ন থানা ভবন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেডকোয়ার্টার্স।
৪. সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার: সামরিক বাহিনীর কৌশলগত অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার সংরক্ষিত ডিপো।
এই সমস্ত স্পর্শকাতর স্থাপনা বোমা বা অত্যাধুনিক বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন মাহেদ।
এরপর থেকেই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার অবস্থান শনাক্ত করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার শুরু করে।
নিষিদ্ধ সংগঠন ‘মাকতাবাহ আল হিম্মাহ’ এবং পেনড্রাইভ রহস্য
জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে,
মাহেদ নিষিদ্ধ ঘোষিত আন্তর্জাতিক ভাবাদর্শের উগ্রবাদী সংগঠন ‘মাকতাবাহ আল হিম্মাহ আদদাওয়াতুল ইসলামিয়াহ’-এর একজন অত্যন্ত সক্রিয় ও উচ্চ-পর্যায়ের সদস্য।
গ্রেপ্তারের পর তার আস্তানা থেকে সিটিটিসি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও ডিজিটাল সরঞ্জাম জব্দ করেছে:
- গোপন পেনড্রাইভ: মাহেদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি পেনড্রাইভকে এই মামলার সবচেয়ে বড় সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের মতে, এই চালকের ভেতরে নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট, হামলার ছক এবং সম্ভাব্য অন্যান্য সহযোগীদের নাম-ঠিকানা সংবলিত ‘অনেক কিছু’ রয়েছে।
- পাসপোর্ট ও সীমান্ত পারাপার: পুলিশের দাবি, মাহেদ বড়লেখার এই সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
- উগ্রবাদী লিটারেচার: তার কাছ থেকে বেশ কিছু নিষিদ্ধ ইসলামিক বই এবং সাংগঠনিক ছবি উদ্ধার করা হয়েছে।
সিটিটিসি-র তদন্ত: রাজধানী থেকে পাহাড়ের সংযোগ
মাহেদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেই ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা ছিল। ও
ই মামলার তদন্তভার রয়েছে পুলিশের এলিট জঙ্গিবিরোধী শাখা সিটিটিসি-র হাতে।
বড়লেখা থানার ওসি মনিরুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশ-কে জানিয়েছেন, শেরেবাংলা নগর থানার মামলার সূত্র ধরে ইতিপূর্বে ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন উগ্রবাদীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং উদ্ধারকৃত নথিপত্র (Documents) বিশ্লেষণ করেই গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে, এই পুরো চক্রের পেছনের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা মূল হোতা হলেন এই মাহেদ।
নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলার প্রত্যয়
সাবেক সেনা সদস্য মাহেদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের কাউন্টার-টেররিজম বিভাগের জন্য একটি বিশাল সাফল্য।
এর মাধ্যমে রাজধানী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর নেমে আসা একটি বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী হামলার আশঙ্কা আপাতত টলে গেল।
তবে, পেনড্রাইভে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই মাকতাবাহ আল হিম্মাহ নেটওয়ার্কের বাকি সদস্যদের খুঁজে বের করা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, মাহেদকে আরও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই উগ্রবাদী চক্রের অর্থায়নের উৎস এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের সম্পূর্ণ রূপটি উন্মোচিত হবে।
