সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে অপপ্রচার, গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে অপপ্রচার: উদ্দেশ্য, উদ্বেগ ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কিছু অনিবন্ধিত সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব অপতথ্যের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউবভিত্তিক চ্যানেল এবং কিছু ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টালে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে নানা ধরনের ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অংশ হিসেবেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
অপপ্রচারের পেছনে কারা?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী একটি চক্র সামাজিক অস্থিরতা তৈরি ও জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব গুজব ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, নির্বাচন, সামরিক আধুনিকায়ন কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির সময় এ ধরনের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা দ্রুত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ যখন “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির আলোকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখনই একটি মহল ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নকে ঘিরে বিতর্ক
প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন কার্যক্রম, বিশেষ করে নতুন যুদ্ধবিমান ক্রয় ও প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় সামনে আসার পর থেকেই অপপ্রচার বাড়তে শুরু করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিছু অনলাইন মাধ্যমে বিমানবাহিনী প্রধানকে ঘিরে মামলা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন কিংবা উগ্রপন্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে নানা ধরনের তথ্য প্রচার করা হয়।
তবে এসব বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি।
ফলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই এসব তথ্যকে “গুজবনির্ভর প্রচারণা” হিসেবে দেখছেন।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, কোনো যাচাই ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। কারণ, এতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইএসপিআরের সতর্কবার্তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে জড়িয়ে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছে আইএসপিআর।
সংস্থাটি জনগণকে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। আইএসপিআরের এক বিবৃতিতে বলা হয়,
নির্বাচন পরিচালনা কিংবা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার বড় অংশই ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এ ছাড়া সেনাসদরের সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান বলেন, “কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়াচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ও ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং দায়িত্ব পালনে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের বিস্তার
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুজব ছড়ানোর অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট বিস্তার, ভুয়া পেজ, বেনামি ইউটিউব এবং অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল ব্যবহার করে দ্রুত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি তথ্য ভাইরাল হওয়ার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
কারণ, সামরিক বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভুল তথ্য দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
ফলে বাহিনীটির প্রতি জনগণের আস্থা দীর্ঘদিনের। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ঘিরে
পরিকল্পিত অপপ্রচার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলে।
তাই সচেতন মহল বলছে, গুজব প্রতিরোধে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
