হামের উপসর্গে দেশে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু। প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে উদ্বেগ ও সতর্কতা।
হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে উদ্বেগ
দেশে হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) প্রকাশিত নিয়মিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টায় ৬ শিশুর মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।
তবে মৃত শিশুদের বয়স, ঠিকানা বা চিকিৎসাধীন হাসপাতালের বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হতে পারে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বৃদ্ধি পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা অন্যান্য সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা নিতে দেরি হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হাম কী এবং কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টিকা গ্রহণের মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সতর্কতা
হামের উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং তথ্য সংগ্রহে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অভিভাবকদের শিশুদের স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
টিকাদানের গুরুত্ব পুনরায় আলোচনায়
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা।
দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের নিয়মিত হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।
কিন্তু কোনো কারণে টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামকে সাধারণ জ্বর বা মৌসুমি রোগ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
তাদের মতে—
- শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
- জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
- আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা রাখতে হবে।
- পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যু দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি এবং নতুন সংক্রমণের খবর পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তাই অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
