রাজধানীর মতিঝিলে দিনদুপুরে লোকমান হোসেন নামে এক ডলার ব্যবসায়ীকে গুলি করে ব্যাগভর্তি ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নিয়েছে মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে এক দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ব্যস্ততম শাপলা চত্বর এলাকায় জনসম্মুখে এক ডলার ব্যবসায়ীকে গুলি করে লাখ লাখ টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা ছিনিয়ে নিয়েছে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। আজ রোববার বিকেল ৩টার দিকে শাপলা চত্বর সংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজের নিচে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। আহত ব্যবসায়ীর নাম লোকমান হোসেন। তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কমিশনের ভিত্তিতে ডলার কেনাবেচার ব্যবসা করেন। ঘটনার পরপরই তাকে গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফিল্মি কায়দায় ঘিরে ধরে আক্রমণ: প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা যায়,
রোববার বিকেলে লোকমান হোসেন বক চত্বর এলাকা থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বরে আসেন।
ঘড়িতে তখন বিকেল ৩টা। তিনি অটোরিকশা থেকে নামামাত্রই পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা তিনটি মোটরসাইকেল তার গতিরোধ করে।
মোটরসাইকেল তিনটিতে মোট ছয়জন আরোহী ছিল।
অটোরিকশা থেকে লোকমান নামার সাথে সাথেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা তিন সন্ত্রাসী দ্রুত নেমে তাকে ঘিরে ধরে।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা লোকমানের হাতে থাকা টাকার ব্যাগটি টেনেহিঁচড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
লোকমান নিজের কষ্টার্জিত টাকা বাঁচাতে ব্যাগটি শক্ত করে ধরে রাখেন এবং বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের মধ্যে দুইজন তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি চালায়।
অস্ত্রের মুখে জিম্মি জনাকীর্ণ মতিঝিল
যে স্থানে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। বিকেল ৩টায় সেখানে শত শত পথচারী ও ভাসমান দোকানদার উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু চোখের সামনে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটলেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি।
মূলত ছিনতাইকারীদের হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় এবং তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালানোর হুমকি দেওয়ায় সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচাতে পিছু হটেন।
ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তার হাত থেকে ডলারভর্তি ব্যাগ এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয়।
এরপর অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তারা তিনটি মোটরসাইকেলে চেপে নটরডেম কলেজের সড়ক ধরে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
লুট হওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়ে ধোঁয়াশা
ছিনতাই হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক পরিমাণ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আহত লোকমান হোসেন একেকবার একেক তথ্য দিচ্ছেন।
প্রথম বক্তব্য: ঘটনার পরপরই তিনি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জানান যে, তার ব্যাগে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা) ছিল।
দ্বিতীয় বক্তব্য: পরবর্তী সময়ে তিনি আবার দাবি করেন যে, ব্যাগে ২০ হাজার মার্কিন ডলার ছিল।
মতিঝিল থানার একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান,
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী চিকিৎসাধীন এবং মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত থাকায় অর্থের সঠিক অংক নিয়ে দুই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।
তবে ব্যাগে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত।
উদ্ধার ও বর্তমান শারীরিক অবস্থা
সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে মতিঝিল থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
এর মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন লোকমানের ভাই বিল্লাল হোসেন।
তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় ভাইকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সহায়তায় একটি রিকশায় তুলে দ্রুত মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, লোকমানের শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে এবং বর্তমানে তাকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত কি না, তা এখনো চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেননি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও তদন্ত
দিনের আলোতে ঢাকার প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় এমন দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুরো এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার পর থেকেই মতিঝিল থানা পুলিশসহ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল অপরাধীদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল এবং তার আশেপাশের ভবনের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে।
সন্ত্রাসীরা যে রুট দিয়ে পালিয়ে গেছে, সেই নটরডেম কলেজ ও কমলাপুরগামী সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোও স্ক্যান করা হচ্ছে।
পুলিশ আশাবাদী, দ্রুতই এই চক্রটিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
মতিঝিলের মতো একটি অতি-নিরাপদ এবং সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারায় থাকা বাণিজ্যিক এলাকায় দিনদুপুরে মোটরসাইকেল নিয়ে এসে গুলি করে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা সাধারণ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ পাড়া হিসেবে পরিচিত মতিঝিলে অপরাধীদের এমন দুঃসাহস প্রমাণ করে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে যারা নগদ অর্থ কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের নিরাপত্তা এখন বড় ঝুঁকির মুখে।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
