আওয়ামী লীগকে দমন করার নীতির পরিণতি সুখকর হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সাবির মুস্তাফা। রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
আ. লীগ দমনে সংঘাতের শঙ্কা, সতর্ক করলেন সাবির মুস্তাফা
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে দমন করার নীতি গ্রহণ করা হলে তার পরিণতি সুখকর নাও হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারকে সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় মধ্যমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শনিবার (৬ জুন) ‘মানচিত্র’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। তার বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সরকারের সচেতন থাকার আহ্বান
আলোচনায় সাবির মুস্তাফা বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে বর্তমান সরকার অবগত। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ক্ষমতার পালাবদলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল মনে করে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি এবং জনসমর্থন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, একটি দল রাজনৈতিক সংকট বা প্রতিকূল সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও পরিস্থিতি বদলালে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
আওয়ামী লীগকে নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ
সাবির মুস্তাফা বলেন, যদি কেউ মনে করে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন একেবারে শেষ হয়ে গেছে এবং দলটি আর রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক নয়, তাহলে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে।
তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ একসময় কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটি আবারও রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি সহজ নয়। একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে গেলে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
‘দমননীতি’ কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী দল দমনের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল উভয়ই রাজনৈতিক চাপ, মামলা, গ্রেপ্তার এবং আন্দোলন-সংক্রান্ত বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সাবির মুস্তাফা বলেন, সরকার চাইলে দমনমূলক নীতি অনুসরণ করতে পারে। তবে এর ফলাফল ইতিবাচক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি সমাজে বিভাজনও গভীর হতে পারে।
সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা
সাবির মুস্তাফার মতে, রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবর্তে মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, সংঘাতের পটভূমি ধীরে ধীরে তৈরি হয়। শুরুতে সেটি দৃশ্যমান না হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাত অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সমঝোতার পথের ওপর গুরুত্ব
আলোচনায় সাবির মুস্তাফা বিকল্প পথ হিসেবে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি সামনে আনেন।
তার মতে, সরকার যদি সংঘাত এড়াতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক সংলাপ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির দিকে এগোতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে এনে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে তিনি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও ইঙ্গিত করেন।
তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে না ধরে মূলত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
সাবির মুস্তাফার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একটি অংশ মনে করছে, দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সব রাজনৈতিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আরেকটি অংশ অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছে।
ফলে রাজনৈতিক সমঝোতা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সামনে কোন পথে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। নির্বাচন, রাজনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ
এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে সংলাপ, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশ জোরদার করা প্রয়োজন।
সাবির মুস্তাফার বক্তব্যও মূলত সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে—রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে,
কিন্তু তা কি সংঘাতের দিকে যাবে, নাকি সমঝোতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাবির মুস্তাফার সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে ঘিরে নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
নিয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে দমন করার চেষ্টা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
তাই সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির পথই দেশের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে।
