জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ। ড. ইউনূসের নাম না থাকা ও পর্দার আড়ালের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বিশেষ সংবাদ বিশ্লেষণ।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চ হলো জাতিসংঘ। আর এই বিশ্ব সংস্থার শীর্ষ পদ অর্থাৎ ‘মহাসচিব’ (Secretary-General) পদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতি পাঁচ বছর পর পর বিশ্বজুড়ে এক অলিখিত ক্ষমতার খেলা শুরু হয়। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে এই শীর্ষ পদের এক কাল্পনিক খায়েশ বা জল্পনা ডালপালা মেলেছিল। তাঁর এক শ্রেণীর অতি-উৎসাহী সমর্থক ও অনলাইন প্রচারক দল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি আবহ তৈরি করেছিলেন, যেন ড. ইউনূস খুব শীঘ্রই নিউ ইয়র্কের সদর দপ্তরে বিশ্বনেতার আসনে বসতে চলেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বাস্তব সত্য এবং পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক সমীকরণ এই অমূলক ধারণাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর যে অনড় বাস্তব পরিস্থিতি সামনে এসেছে, তাতে সেই কাল্পনিক স্বপ্নের বেলুনটি এক নিমেষেই ভেস্তে গেছে।
চূড়ান্ত চার প্রার্থীর তালিকা: যেখানে নেই কোনো বাংলাদেশী নাম
জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী, পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
বিশ্বস্ত কূটনৈতিক সূত্র ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নথি অনুযায়ী, এই পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রধান চারজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব ও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত চার হেভিওয়েট প্রার্থী হলেন:
- রাফায়েল মারিয়ানো গ্রসি (Rafael Mariano Grossi): বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক এবং তাঁর নাম প্রস্তাব করেছে খোদ আর্জেন্টিনা সরকার।
- মিশেল ব্যাশলে জেরিয়া (Michelle Bachelet Jeria): চিলির সাবেক জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। তাঁর প্রার্থিতাকে যৌথভাবে সমর্থন ও প্রস্তাব করেছে চিলি, ব্রাজিল এবং মেক্সিকো।
- ম্যাকি সল (Macky Sall): সেনেগালের সাবেক সফল রাষ্ট্রপ্রধান। আফ্রিকান মহাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব করেছে বুরুন্ডি।
- রেবেকা গ্রিনস্প্যান মায়ুফিস (Rebeca Grynspan Mayufis): জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (UNCTAD)-এর বর্তমান মহাসচিব। কোস্টারিকার নাগরিক এই নারী নেত্রীর নাম প্রস্তাব করেছে তাঁর নিজের দেশ কোস্টারিকা।
এই চার প্রার্থীর বাইরে বর্তমান তালিকায় আর কোনো নাম নেই,
যা প্রমাণ করে যে ড. ইউনূসের জাতিসংঘ প্রধান হওয়ার আলোচনাটি ছিল স্রেফ কিছু মহলের তৈরি করা একটি ফাঁপা ও লোকদেখানো রাজনৈতিক প্রচার মাত্র।
নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা ও অলিখিত বাস্তবতার দেয়াল
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি আনুষ্ঠানিক ভোট বা লোকদেখানো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার রেওয়াজ থাকলেও,
আদতে এই পদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) রুদ্ধদ্বার কক্ষে।
বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন এবং রাশিয়া
—যাদের হাতে রয়েছে অসীম ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা, তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া কেউ এই পদে আসীন হতে পারে না।
স্থায়ী পাঁচ শক্তির যেকোনো একটি রাষ্ট্র যদি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটিমাত্র ভেটো প্রয়োগ করে,
তবে তাঁর সমস্ত সম্ভাবনা সেখানেই সমাহিত হয়।
এই বাস্তবতায়, ড. ইউনূস যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে এই পদের জন্য লবিং বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতেন,
তবে বেইজিং কিংবা মস্কোর পক্ষ থেকে তাঁর ওপর ভেটো আসা ছিল অবধারিত।
কারণ, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে ক্রেমলিন এবং বেইজিং ড. ইউনূসকে সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটন তথা মার্কিন প্রশাসনের স্বার্থরক্ষাকারী বা ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করে।
মস্কোর অভ্যন্তরীণ সোর্স ও ক্রেমলিনের অনড় মনোভাব
এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ড. ইউনূসের প্রতি রাশিয়ার মনোভাবের বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট।
দীর্ঘ সাত বছর রাশিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থার প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বর্তমানে সে দেশের ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় দৈনিক ‘রোসিসকায়া গ্যাজেটা’ (Rossiyskaya Gazeta) পত্রিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুবাদে মস্কোর নীতিনির্ধারক মহলে রয়েছে গভীর সংযোগ। রাশিয়ার প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আরটি (RT)-এর এডিটর-ইন-চিফ মার্গারিটা সিমনইয়ান এবং রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ বার্তা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার ফুটে ওঠে।
ক্রেমলিনের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও নীতি-নির্ধারণী সূত্র নিশ্চিত করেছে যে,
মস্কো কোনো অবস্থাতেই ড. ইউনূসের মতো কোনো ব্যক্তিত্বকে জাতিসংঘের শীর্ষ পদের জন্য সমর্থন দেবে না।
রাশিয়ার রাজনৈতিক দর্শন অনুযায়ী, ড. ইউনূসের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড মূলত পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ এজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আর এ কারণেই বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্তারা সম্প্রতি বেইজিং সফর শেষ করে বর্তমানে মস্কোতে অবস্থান করছেন এবং চীন ও রাশিয়ার সমর্থন আদায়ের জন্য এক ধরণের মরিয়া কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক লবিংয়ের এই দেয়াল ভাঙা ঢাকার জন্য অসম্ভব।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ:
পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে যখন কোনো ব্যক্তি বা সরকার একটি সুনির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ে,
তখন অপর ব্লকের স্থায়ী ভেটো ক্ষমতাধারী রাষ্ট্রগুলো তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমস্ত পথ বন্ধ করে দেয়।
ড. ইউনূসের ক্ষেত্রেও রাশিয়ার এই অনড় অবস্থান তারই প্রতিফলন।
রোসাটম বিতর্ক এবং ড. ইউনূসের কৌশলগত ভুল
রাশিয়ার সাথে ড. ইউনূসের প্রশাসনের দূরত্ব তৈরির পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’ (Rosatom) এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রোসাটমের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অভিযোগ তোলা হয়।
দাবি করা হয়েছিল যে, এই প্রকল্পটির চুক্তি বা বাস্তবায়নের খাতিরে রোসাটম নাকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ অনৈতিক সুবিধা বা ঘুষ হিসেবে প্রদান করেছে। কোনো ধরনের অকাট্য আন্তর্জাতিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই রাশিয়ার অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন মারাত্মক অভিযোগ তোলায় ক্রেমলিন চরম ক্ষুব্ধ হয়। এই ধরণের নীতিহীন ও কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মস্কোর কাছে স্থায়ীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
উচ্চাভিলাষী স্বপ্নের নির্মম সমাপ্তি
পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার যে কাল্পনিক স্বপ্ন বা ‘দিবাস্বপ্ন’ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিংবা তাঁর চারপাশের অনুসারীরা দেখেছিলেন,
তা আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কঠিন মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
চারজন চূড়ান্ত প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর এখন আর কোনো ধোঁয়াশা অবশিষ্ট নেই।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাহবা পাওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে বট বাহিনী বা কৃত্রিম প্রচারণার জোর খাটানো গেলেও,
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা এবং পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে এই ধরণের সস্তা প্রচারণা যে কতটুকু অসহায়,
তা এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।
এক তরফা পশ্চিমা নির্ভরতা এবং পরাশক্তি রাশিয়ার সাথে অযাচিত দ্বন্দ্বে জড়ানোর খেসারত হিসেবেই এই উচ্চাভিলাষী খায়েশের এমন ধপাস অবসান ঘটলো।
–যার লিখা থেকে বিশ্লেষনঃ সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী , একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট- সম্পাদক, ব্লিটজ
