আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেখ হাসিনার বার্তা। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেখ হাসিনার বার্তা: গণতন্ত্র, ইতিহাস ও রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধারের আহ্বান
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশবাসীর উদ্দেশে দীর্ঘ বার্তা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশবাসী, দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে একটি বিস্তারিত বাণী দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত এই বার্তায় তিনি আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দলটির ভূমিকা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ২৩ জুন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ৭৭ বছরের পথচলায় জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসঙ্গ
বার্তায় শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি নন, তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
তার ভাষায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংবিধান এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাণীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ওপরও আঘাত ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে সামরিক শাসন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এবং গণতন্ত্রবিরোধী রাজনীতির বিস্তার ঘটেছে। তবে আওয়ামী লীগ বারবার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে জনগণের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন শেখ হাসিনা
বার্তায় শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, আওয়ামী লীগের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস নয়, এটি উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের ইতিহাসও।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
শেখ হাসিনার বাণীর বড় অংশজুড়ে ছিল বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার মূল্যায়ন। তিনি অভিযোগ করেন,
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানি চলছে।
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন নয়।
একইসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অধিকারকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি বার্তা
বাণীতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতিও আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো সংবিধান, আইন
এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি মনে করিয়ে দেন যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন
এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ঐক্যের আহ্বান
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সময় আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন সময় হলেও দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি নেতা-কর্মীদের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর, নির্যাতিত মানুষের সহযোগিতা করার এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যে উঠে আসে যে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সীমিত করা গেলেও জনগণের হৃদয় থেকে দলটিকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়
বাণীর শেষাংশে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করার ইতিহাস এবং জনগণের সমর্থন নিয়ে দলটি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
তিনি দেশের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
একইসঙ্গে বিভাজন, প্রতিহিংসা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও আহ্বান জানান।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন শপথের আহ্বান
বাণীর সমাপ্তিতে শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ
এবং গণতন্ত্রের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ভয় নয় সাহস, বিভেদ নয় ঐক্য, প্রতিহিংসা নয় ন্যায়বিচার
এবং অন্ধকার নয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ অনুসরণের নতুন শপথ নিতে হবে। তার মতে,
আওয়ামী লীগ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও জনগণের সঙ্গে থাকবে এবং জনগণের শক্তিতেই দলটি রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
