ইতিহাসের এক নতুন বাঁক: ঢাকা সেনানিবাসে নিভল চিরন্তন চেতনার প্রতীক ‘শিখা অনির্বাণ’, সেনাপ্রধানের নতুন রূপ নিয়ে খোদ সামরিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সেনানীদের আত্মত্যাগের চিরন্তন স্মারক হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসে অবিরাম জ্বলতে থাকা ‘শিখা অনির্বাণ’ গত ৩ মে থেকে অন্ধাকারে নিমজ্জিত রয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যে শিখাটি কখনো নেভেনি, তা হঠাৎ কেন নিভিয়ে দেওয়া হলো—তা নিয়ে খোদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ এবং বিস্ময়। এর ঠিক পরপরই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অবয়বে আসা আকস্মিক পরিবর্তন তথা দাড়ি রাখার সিদ্ধান্ত এই আলোচনাকে এক ভিন্ন মাত্রায় রূপ দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক চন্দন নন্দীর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো উঠে এসেছে, যা দেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতির এক গভীর পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে।
মে মাসের সেই সকাল: যেভাবে নিভল চিরন্তন আলোকবর্তিকা
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কিছু সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৩ মে সকাল ঠিক ৭টা থেকে ‘শিখা অনির্বাণ’ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস (এমইএস)-এর ঢাকা সেনানিবাস উপ-বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন অতি গোপনে কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ অংশের কাছে এই তথ্যটি প্রথম প্রকাশ করেন।
তিনি স্পষ্ট জানান যে, ‘জিই আর্মি সাউথ’ (GE Army South)-এর মাধ্যমে একটি উচ্চতর বা শীর্ষ কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশনার পর এই প্রতীকী আলোটি নিভিয়ে দেওয়া হয়।
তবে ঠিক কী কারণে এই “সাময়িক স্থগিতাদেশ” বা বাতি নেভানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো,
সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা যৌক্তিক কারণ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত” এই স্থানটি অন্ধকারই থাকবে।
শিখা অনির্বাণের জাতীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ গুরুত্ব
ঢাকা সেনানিবাসের এই পুণ্যভূমিটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি সশস্ত্র বাহিনী দিবসের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোচ্চ স্থান।
দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক, সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই শিখাটি ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতীক।
সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এত বড় এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি সিদ্ধান্ত সেনাপ্রধানের অজ্ঞাতসারে হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, এই ঘটনাটি ঘটার ঠিক তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে (২২ মে) সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
মক্কা থেকে ফেরা এবং সেনাপ্রধানের নতুন অবয়ব: ইসলামিকীকরণের ইঙ্গিত?
৬ দিনের হজ পালন শেষে গত ২৭ মে সেনাপ্রধান ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।
তবে ফিরে আসার পর প্রায় এক সপ্তাহেরও বেশি সময় তিনি নিজেকে জনসমক্ষ থেকে আড়ালে রেখেছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি যখন প্রথমবার জনসম্মুখে আসেন, তখন তাঁর মুখে সুবিন্যস্ত দাড়ি দৃশ্যমান হয়।
কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, তাঁর এই দাড়ি রাখার সিদ্ধান্ত অদূর ভবিষ্যতে বদলানোর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না,
যা তাঁর চাকুরির মেয়াদের শেষ এক বছরে এক ধরনের “চরম ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ইতিহাসে জেনারেল জামানই সম্ভবত প্রথম কর্মরত সেনাপ্রধান, যিনি পূর্ণাঙ্গ দাড়ি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্বাধীনতা-উত্তর ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক সংস্কৃতি থেকে সরে এসে বাহিনীর একটি বড় অংশে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় বা ইসলামিকীকরণের ভাবধারা ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
অবসরপ্রাপ্ত একজন মেজর জেনারেলের ভাষ্য: “সেনাবাহিনীর প্রবিধান অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা দাড়ি রাখতে চাইলে তাঁর কমান্ডিং অফিসারের লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্বয়ং সেনাপ্রধানের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা সামরিক সংবিধানে স্পষ্ট নয়। এই দাড়ি রাখা সাধারণ সৈনিকদের মাঝে এমন এক বার্তা পাঠাবে যা সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যগত বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পরিপন্থী, যেখানে টিম-ওয়ার্ক বা দলগত একাত্মতাই হলো প্রধান মূলমন্ত্র।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটভূমি এবং ঐতিহাসিক সংযোগ
এই পুরো ঘটনাটিকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’-এর একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
২০২৪ সালের ২৩ জুন দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনারেল জামান তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রক্রিয়াটি ঠেকাতে বা শান্ত করতে কোনো কার্যকর সামরিক ভূমিকা নেননি বলে সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর, সেনানিবাসের এক বিশেষ রাজনৈতিক সমাবেশে নিষিদ্ধঘোষিত এবং কট্টরপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাঁর উপস্থিতিতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি তৎকালীন সময়েই অনেক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলকে সন্দিহান করে তুলেছিল। এমনকি ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা রোধেও তৎকালীন সময়ে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো জোরালো প্রতিরোধ বা হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি।
| সময়কাল | গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ |
| ২৩ জুন, ২০২৪ | জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কর্তৃক সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ। |
| ৫ আগস্ট, ২০২৪ | রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জামায়াত আমিরের সাথে সেনানিবাসের বৈঠক। |
| ৩ মে, ২০২৬ | জিই আর্মি সাউথের নির্দেশে ‘শিখা অনির্বাণ’ নিভিয়ে ফেলা। |
| ২২ মে, ২০২৬ | সেনাপ্রধানের পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন। |
| জুন, ২০২৬ | মুখে পূর্ণ দাড়ি সহ সেনাপ্রধানের জনসমক্ষে আগমন। |
ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের উদ্বেগ ও আগামীর বাংলাদেশ
বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ ধারার প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দৃশ্যত নিষিদ্ধ এবং মূলধারার রাজনীতির বাইরে অবস্থান করছে।
এই সুযোগে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর অন্দরেও যে এক বিশাল আদর্শিক রূপান্তর ঘটছে,
‘শিখা অনির্বাণ’ নিভে যাওয়া এবং সেনাপ্রধানের দাড়ি রাখার ঘটনাকে তারই একটি বাস্তব রূপক হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই প্রতীকী পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশকে একটি চরমপন্থী বা কট্টর ইসলামিক ব্লকের দিকে ধাবিত করতে পারে,
যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এক বড় ধরনের পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
শেষ পর্যন্ত এই সাময়িক নিভে থাকা আলো আবার কবে জ্বলে উঠবে, নাকি এটিই বাংলাদেশের এক নতুন পরিচয়ের সূচনা—তা সময়ই বলে দেবে।
