মোহাম্মদপুরের ট্রাকচালক হত্যা মামলায় পলকের আদালতে আপত্তি, দুই আসামি হাজির না হওয়ায় অভিযোগ গঠন শুনানি পিছিয়ে ২৬ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
তবে দিনের কার্যক্রমে মামলার অভিযোগ গঠনের চেয়ে আদালতে তাঁর একটি বক্তব্য বেশি আলোচনায় আসে।
আদালতের ছয়তলায় নেওয়ার পদ্ধতি এবং হাতকড়ার অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানান পলক।
তাঁর দাবি, লিফট চালু থাকার পরও তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নেওয়া হয়েছে।
এ সময় তাঁর দুই হাত পেছনে হাতকড়া দিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মানবিক বিবেচনায় হাতকড়া সামনে রাখার ব্যবস্থা চেয়েছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করেও একটি মন্তব্য করেন তিনি।
সেই মন্তব্যকে হুমকির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
তবে পলকের আইনজীবীর ব্যাখ্যা, কথাটির অর্থ ছিল রাজনৈতিক ও অবস্থানগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
অন্যদিকে মামলার মূল অভিযোগের শুনানি এদিন আর এগোয়নি।
কারাগারে থাকা দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা সম্ভব না হওয়ায় শুনানি পিছিয়ে যায়।
পরবর্তী শুনানির জন্য ২৬ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
আদালতে পলকের আপত্তির শুরু যেভাবে
বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ মামলাটির অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ছিল।
বিচারক রবিউল আলমের আদালতে মামলার সংশ্লিষ্ট আসামিদের হাজির করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কারাগারে থাকা আটজনকে আদালতে হাজির করা হলেও সবাইকে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে ছিলেন সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও।
আদালতে ওঠার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন পলক।
বিচারকের অনুমতি নিয়ে তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পলকের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল আদালত ভবনের ছয়তলায় ওঠার বিষয়টি।
তিনি বলেন, লিফট চালু দেখতে পেয়েও তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নেওয়া হয়েছে।
তখন তাঁর হাত পেছনে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এতে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তাঁর জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার আবেদন জানান তিনি।
হাতকড়া সামনে রাখার অনুরোধ
আদালতে পলকের বক্তব্যের একটি বড় অংশ ছিল হাতকড়া ব্যবহারের ধরন নিয়ে।
তিনি পেছনে হাতকড়া না রেখে সামনে রাখার অনুরোধ করেন।
পলকের ভাষ্য অনুযায়ী, সামনে হাতকড়া রাখলেও নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব।
এ কারণে তিনি আদালতের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান।
তাঁর বক্তব্যের পর বিচারক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন।
বিচারকের বক্তব্য ছিল, আসামিদের নিরাপত্তার জন্যই এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এরপর পলক আবার হাতকড়া সামনে রাখার যুক্তি তুলে ধরেন।
এতে আদালতের কার্যক্রমের মধ্যে নিরাপত্তা ও মানবিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।
তবে এ বিষয়ে আদালতের পক্ষ থেকে কোনো আলাদা আদেশের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি মূলত পলকের ব্যক্তিগত আপত্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে ঘিরে পলকের মন্তব্য
আদালতে নিজের আপত্তি জানানোর একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর প্রসঙ্গ তোলেন পলক।
তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ পরে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
পলক রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁর অবস্থান থেকে দূরত্ব খুব বেশি নয়।
এই বক্তব্যকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর মতে, মন্তব্যটির মাধ্যমে আইনজীবীদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
এমন বক্তব্য আদালতের পরিবেশে অনাকাঙ্ক্ষিত বলেও মনে করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
অন্যদিকে পলকের পক্ষের আইনজীবী বিষয়টি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখতে রাজি নন।
তাঁদের ব্যাখ্যায়, পলক তাঁর বর্তমান অবস্থান এবং আগের অবস্থানের পরিবর্তন বোঝাতে চেয়েছেন।
অর্থাৎ বক্তব্যটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন নিয়ে একটি ইঙ্গিত।
এ কারণে দুই পক্ষের বক্তব্যে একই মন্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
পলকের বক্তব্য নিয়ে দুই পক্ষের দুই ব্যাখ্যা
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর অবস্থান ছিল কঠোর।
তিনি মনে করেন, পলকের মন্তব্যে চাপ তৈরির একটি বার্তা ছিল।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ বলছে, বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে অর্থ বদলে যেতে পারে।
তাদের মতে, পলক তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতা বোঝাতে চেয়েছেন।
এ কারণে বক্তব্যটির ব্যাখ্যায় দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।
তবে আদালত এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, এমন তথ্য নেই।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমও ওই বক্তব্যের কারণে থেমে যায়নি।
মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে অন্য দুই আসামির আদালতে অনুপস্থিতির কারণে।
তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত না হওয়ায় অভিযোগ গঠনের শুনানি আর এগোয়নি।
কেন পিছিয়ে গেল অভিযোগ গঠনের শুনানি
বৃহস্পতিবার অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও সেটি কার্যত পিছিয়ে যায়।
মামলার দুই আসামি সাজ্জাদ হোসেন ও নাইমুল হাসান রাসেলকে আদালতে আনা হয়নি।
তাঁদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুনানি থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ফলে একই সময়ে দুই আদালতে তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এ কারণে মামলার অভিযোগ গঠন নিয়ে বিস্তারিত শুনানি করা যায়নি।
আদালত পরে নতুন তারিখ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়।
আগামী ২৬ অক্টোবর অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এম. আনিছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের কার্যক্রমে মামলার অভিযোগের ওপর আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
পরবর্তী শুনানিতে আবার বিষয়টি সামনে আসবে।
এর আগে একবার পিছিয়েছিল শুনানি
এই মামলার অভিযোগ গঠন শুনানি এর আগেও পিছিয়েছিল।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে শুনানির জন্য দিন নির্ধারিত ছিল।
তখন পলককে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
তিনি অন্য একটি মামলার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল।
তখন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নতুন দিন ঠিক করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ৮ অক্টোবর শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছিল।
কিন্তু এবারও দুই আসামির অনুপস্থিতিতে কার্যক্রম আবার পিছিয়ে গেল।
ফলে মামলাটির অভিযোগ গঠন এখন ২৬ অক্টোবরের শুনানির দিকে গড়াল।
আদালত থেকে নামার সময়ও পলকের ক্ষোভ
শুনানি শেষে পলককে আদালত ভবন থেকে নিচে নেওয়া হয়।
ওপরের দিকে ওঠার অভিজ্ঞতার পর নিচে নামার সময়ও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
লিফট ব্যবহারের প্রসঙ্গ আবারও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
পলকের অভিযোগের সারকথা ছিল, লিফট ব্যবহারে তাঁকে সুবিধা দেওয়া হয়নি।
তাঁর মন্তব্যের মাধ্যমে আদালত ভবনে ওঠানামার পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পায়।
তবে পরে তাঁকে লিফটে করে নিচে নামানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
মামলার পেছনের ঘটনা
এবার আসা যাক মামলার মূল ঘটনার দিকে।
মামলাটি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওই বছরের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে।
সেখানে গুলিবিদ্ধ হন মালবাহী ট্রাকের চালক মো. হোসেন।
তিনি সেদিন গাবতলী এলাকায় তাঁর ট্রাক রেখে বাড়ির পথে ফিরছিলেন।
পথে চাঁদ উদ্যান এলাকায় পৌঁছানোর পর গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
হোসেনের মা রীনা বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
মামলা করার পর তদন্ত
হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট মামলা করা হয়।
মামলাটি করা হয় মোহাম্মদপুর থানায়।
পরে পুলিশ ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক আকরামুজ্জামান।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
সেই অভিযোগপত্রে মোট ৩৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পলকের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা এবং আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।
৩৪ আসামির মামলায় কার অবস্থান কোথায়
মামলার নথি অনুযায়ী, ৩৪ আসামির অবস্থান এক রকম নয়।
কেউ কারাগারে রয়েছেন এবং কেউ জামিনে আছেন।
আবার কয়েকজন আসামি পলাতক রয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
কারাগারে থাকা আসামিদের মধ্যে পলকের নামও রয়েছে।
সাদেক খান, ফুরকান হোসেন এবং শাজাহান খানের নামও এসেছে।
মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে আসামিদের আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়া চলছে।
তবে একাধিক মামলায় একই ব্যক্তির বিচারিক কার্যক্রম থাকায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের শুনানি পিছিয়ে যাওয়ার পেছনেও এমন সমান্তরাল বিচারিক কার্যক্রম ছিল
অভিযোগপত্রে যাঁদের নাম এসেছে
মামলার অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম রয়েছে। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এ মামলার আসামি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নামও অভিযোগপত্রে রয়েছে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের নামও এসেছে। সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নামও রয়েছে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও এই তালিকায় রয়েছেন।
এ ছাড়া আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়
আইনি প্রতিবেদনে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি।
আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়া মানেই আসামির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
অভিযোগপত্র তদন্তকারী সংস্থার তদন্তের ফলাফল তুলে ধরে।
এরপর আদালতে অভিযোগের বিচারিক মূল্যায়ন হয়।
আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও থাকে।
সাক্ষ্য, নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হতে পারে।
সব পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন।
তাই অভিযোগপত্রের কোনো বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।
এই বিষয়টি পাঠকদের জন্য আলাদা করে মনে রাখা প্রয়োজন।
অভিযোগ গঠন বলতে কী বোঝায়
অভিযোগ গঠন বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এই পর্যায়ে আদালত মামলার অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনা করেন।
আদালত অভিযোগের ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করতে পারেন।
অভিযোগ গঠনের পর মামলার বিচার আরও নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রবেশ করে।
তখন সাক্ষ্যগ্রহণসহ পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে অভিযোগ গঠন না হওয়া পর্যন্ত বিচারিক প্রক্রিয়া সেই পর্যায়ে পৌঁছায় না।
এই মামলাতেও বর্তমানে সেই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি সম্পন্ন হয়নি।
কারণ বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত শুনানি আসামিদের অনুপস্থিতিতে পিছিয়ে গেছে।
আগামী ২৬ অক্টোবর আদালত আবার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
পলকের বক্তব্য কেন আলাদা গুরুত্ব পেল
মামলায় আসামি হিসেবে হাজির হলেও পলক এদিন মামলার মূল অভিযোগ নিয়ে বেশি কথা বলেননি।
বরং আদালতে ওঠার পদ্ধতি নিয়ে তাঁর আপত্তি সামনে আসে।
বিশেষ করে লিফট ও সিঁড়ির বিষয়টি তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় হাতকড়ার অবস্থান নিয়ে তাঁর আবেদন।
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে মন্তব্যটি আরও আলোচনার সৃষ্টি করে।
ফলে মামলার নিয়মিত শুনানির বাইরে এই ঘটনাই সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের দিক থেকে মূল বিষয় অন্য।
মূল বিষয় হলো ৩৪ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক অগ্রগতি।
সেই অগ্রগতি বৃহস্পতিবার নতুন করে পিছিয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বনাম মানবিক ব্যবস্থাপনা
পলকের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি বাস্তব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আদালতে আসামি পরিবহনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে শারীরিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে সিঁড়ি ব্যবহারের সময় হাতকড়ার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত।
বৃহস্পতিবার বিচারকের বক্তব্যেও নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে পলক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।
দুই দিকের এই অবস্থান থেকেই ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে।
তবে আদালতের কোনো লিখিত নির্দেশ ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান
রাষ্ট্রপক্ষ মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে প্রয়োজনীয় আসামিদের উপস্থিতি ছাড়া অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি।
দুই আসামি অন্য আদালতের কার্যক্রমে থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন।
এরপর নতুন তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ পলকের মন্তব্য নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে।
তাদের বক্তব্যে ওই মন্তব্যের ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।
তবে অভিযোগ গঠন শুনানির মূল কার্যক্রম সেই মন্তব্যে নির্ভর করেনি।
মামলার পরবর্তী শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
আসামিপক্ষের অবস্থান
অন্যদিকে আসামিপক্ষ আদালতে পলকের প্রতি আচরণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
তাদের বক্তব্য, পেছনে হাতকড়া অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ।
লিফট ব্যবহার করা গেলে পরিস্থিতি সহজ হতে পারত বলে তাদের দাবি।
তারা পলকের বক্তব্যকেও হুমকি হিসেবে দেখছে না।
বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন বোঝাতে তিনি মন্তব্য করেছেন বলে তাদের ব্যাখ্যা।
এ কারণে বক্তব্যের অর্থ নির্ধারণে প্রেক্ষাপট বিবেচনার দাবি উঠেছে।
তবে আদালত এখন পর্যন্ত ওই বক্তব্য নিয়ে আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
মামলার মূল বিচারিক প্রক্রিয়া আগামী শুনানির দিকে এগোচ্ছে।
নিহত হোসেনের পরিবারের জন্য মামলাটির গুরুত্ব
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিহত ট্রাকচালক মো. হোসেন।
তিনি কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না।
তিনি জীবিকার প্রয়োজনে মালবাহী ট্রাক চালাতেন।
২০২৪ সালের আন্দোলন চলাকালে তাঁর মৃত্যু পরিবারকে গভীর সংকটে ফেলে।
পরে তাঁর মা আইনি প্রতিকার চেয়ে মামলা করেন।
তদন্ত শেষে মামলাটি এখন অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।
পরিবারের জন্য এই বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ তাঁরা ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় বিচারিক নিষ্পত্তি প্রত্যাশা করছেন।
তবে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না।
২৬ অক্টোবরের শুনানি এখন গুরুত্বপূর্ণ
বৃহস্পতিবারের শুনানি পিছিয়ে যাওয়ার পর আগামী তারিখ ২৬ অক্টোবর।
সেদিন মামলার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আসামিদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হলে কার্যক্রম এগোতে পারে।
বিশেষ করে অনুপস্থিত দুই আসামির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাঁদের অন্য আদালতের কার্যক্রমের সঙ্গে সময়সূচি কীভাবে সমন্বয় করা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত সেদিন মামলার পরবর্তী ধাপ নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
তবে আগামভাবে আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো অনুমান করা ঠিক হবে না।
বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী নির্দেশই বিষয়টি স্পষ্ট করবে।
ঘটনার দিন থেকে আদালত পর্যন্ত
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে মামলাটির যাত্রা শুরু হয়।
একজন ট্রাকচালকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পরিবার থানায় যায়।
পরবর্তী সময়ে হত্যা মামলা করা হয়।
পুলিশ তদন্ত পরিচালনা করে এবং আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২৫ সালের নভেম্বরে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর মামলা নতুন পর্যায়ে যায়।
অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য একাধিক তারিখ নির্ধারিত হয়েছে।
কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই শুনানি এগোয়নি।
প্রথমে পলকের আদালতে উপস্থিতি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
পরে দুই আসামির অন্য আদালতে উপস্থিতির কারণে শুনানি আবার পিছিয়েছে।
ফলে দীর্ঘ বিচারিক যাত্রায় মামলাটি এখনো অভিযোগ গঠনের ধাপ অতিক্রম করতে পারেনি।
একই দিনে দুই আদালতের কার্যক্রম
বৃহস্পতিবারের ঘটনা বিচারিক কার্যক্রমের সমন্বয়ের একটি দিকও সামনে এনেছে।
একজন আসামির বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় আলাদা আদালতে কার্যক্রম চলতে পারে।
তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোন আদালতে কখন হাজির করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই মামলায় সাজ্জাদ হোসেন ও নাইমুল হাসানের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি হয়েছে।
তাঁদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজিরা থাকায় এই মামলায় আনা সম্ভব হয়নি।
ফলে ৩৪ আসামির মামলায় অভিযোগ গঠন শুনানি আর এগোয়নি।
বিচারিক কার্যক্রমের বাস্তবতায় এমন সমন্বয় অনেক সময় প্রয়োজন হয়।
এবারও আদালত নতুন তারিখ দিয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছেন।
এখন সামনে দুটি বিষয়
মামলাটিতে এখন প্রধানত দুটি বিষয় সামনে রয়েছে।
প্রথমটি হলো অভিযোগ গঠন শুনানি।
দ্বিতীয়টি হলো আদালতে আসামিদের নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করা।
অভিযোগ গঠন হলে মামলাটি পরবর্তী বিচারিক ধাপে যেতে পারে।
তবে তার আগে আদালতকে সংশ্লিষ্ট আসামিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে পলকের আদালতে করা অভিযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
হাতকড়া ও সিঁড়ি ব্যবহারের বিষয়টি ভবিষ্যতে আবার উঠবে কি না, সেটি অনিশ্চিত।
এ বিষয়ে আদালতের কোনো নতুন নির্দেশ এলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
মামলাটি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে।
নিহত ব্যক্তি ছিলেন ট্রাকচালক মো. হোসেন।
তাঁর মা রীনা বেগম মামলা করেছিলেন ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট।
পুলিশ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয়।
অভিযোগপত্রে মোট ৩৪ জনকে আসামি করা হয়।
তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জুনাইদ আহমেদ পলক রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার আটজন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
তবে দুই আসামি অনুপস্থিত থাকায় অভিযোগ গঠন শুনানি হয়নি।
পরবর্তী শুনানির তারিখ ২৬ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে। JJagonews24+1
শেষ কথা
বৃহস্পতিবারের আদালত কার্যক্রম তাই দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে ছিল ট্রাকচালক হোসেন হত্যা মামলার বিচারিক অগ্রগতি।
অন্যদিকে ছিল পলকের আদালতে করা ব্যক্তিগত আপত্তি।
লিফট ব্যবহার, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো এবং হাতকড়ার অবস্থান নিয়ে তিনি কথা বলেন।
রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর একটি মন্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
আসামিপক্ষ আবার সেই বক্তব্যের আলাদা ব্যাখ্যা দিয়েছে।
তবে এসব বিতর্কের মধ্যেও মামলার মূল বিচারিক প্রশ্ন অপরিবর্তিত রয়েছে।
হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় আনা অভিযোগ আদালতে কীভাবে প্রমাণিত হবে, সেটিই মূল বিষয়।
অভিযোগ গঠন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
আগামী ২৬ অক্টোবর মামলাটি আবার আদালতের সামনে আসবে।
সেদিন প্রয়োজনীয় আসামিদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে শুনানি এগোতে পারে।
এরপর মামলাটি কোন পথে যাবে, তা আদালতের পরবর্তী আদেশেই স্পষ্ট হবে।
