রাজনীতি মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে স্থান পাওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। একজন মৃত মানুষের জানাজা পড়া বা আদায় করার মতো মৌলিক ধর্মীয় অধিকারেও যখন রাষ্ট্রযন্ত্র বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বাধা দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে আমরা কোন সমাজে বাস করছি। সাবেক সফল ছাত্রনেতা মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের মরদেহের সঙ্গে যা ঘটে গেল, তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের নীতিমালার সঙ্গে মেলে না। ধর্মের লেবাসধারী কিংবা আধুনিকতার প্রবক্তা—কাউকেই এই অমানবিকতার দায় থেকে মুক্তি দেওয়া চলে না। মৃত ব্যক্তির শেষ বিদায়ের মর্যাদাও যদি রাজনীতির বলি হয়, তবে মানবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
প্রবাসে জীবনাবসান ও দীর্ঘ লড়াই
মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ছিলেন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী একটি নাম। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি মূলধারার দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জটিল ও মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। কলকাতার একটি ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি চরম শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, কিন্তু তার মন সবসময় পড়ে থাকত দেশের মাটিতে। প্রবাসের মাটিতে তার এই নিঃসঙ্গ প্রয়াণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও নিস্তব্ধ শোকের ছায়া ফেলে দেয়।
বেনাপোল থেকে ঢাকা: অন্তিম যাত্রার সূচনা
গত শনিবার ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর ঠিক একদিন পর, অর্থাৎ রোববার বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিবারের সদস্যরা এবং নিকটাত্মীয়রা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কফিনটি গ্রহণ করেন।
নশ্বর এই দেহ দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় এক নতুন রাজনৈতিক নাটকের অংশবিশেষ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় তার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। শোকসন্তপ্ত পরিবার ও সহকর্মীরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং অদৃশ্য ইশারায় সেই পরিকল্পনা শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়। একটি মৃত মানুষের পবিত্র কফিনকে ঘিরেও যে এমন ভীতি ছড়াতে পারে, তা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি।
ধানমন্ডিতে জানাজায় বাধা ও অপ্রীতিকর ঘটনা
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপর জানাজার স্থান পরিবর্তন করে ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদে নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু সেখানেও শোকাহত মানুষের ভিড় জমতে দেওয়া হয়নি এবং জানাজা পড়তে বাধা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, যারা সেই জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলেন তাদের ওপর চড়াও হয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। সেখান থেকে চারজন নেতাকর্মীকে পুলিশ জোরপূর্বক আটক করে থানায় নিয়ে যায়। একজন মৃত নেতার জানাজায় শরিক হওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে দেশের সংবিধান ও আইন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? এই ধরনের আচরণ কেবল অমানবিকই নয়, বরং তা মৌলিক মানবাধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে জানাজার গুরুত্ব
ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী, মৃত্যুর পর একজন মানুষের আর কোনো জাগতিক ক্ষমতা বা অধিকার থাকে না। তিনি যে দল বা মতেরই হোন না কেন, মৃত্যুর পর তিনি কেবল একজন মৃত মুসলিম। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী প্রতিটি মুসলমানের জানাজা পড়া এবং তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে দাফন করা ফরজ ।
কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা রাষ্ট্রীয় আক্রোশ একজন মৃত মানুষের জানাজার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। এটি কেবল ধর্মীয় রীতিনীতির পরিপন্থীই নয়, বরং এটি মানবতা ও সাধারণ আইনেরও সম্পূর্ণ বরখেলাফ। রোটন সাহেব তার জীবদ্দশায় যেমন একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তেমনি তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা করতেন। তার বাবা-মা অনেক আগেই ইন্তেকাল করেছেন এবং তিনি সুযোগ পেলেই ঢাকায় ছুটে যেতেন তাদের কবর জিয়ারত করতে। অথচ আজ তার নিজের বেলায় তাকওয়া মসজিদের মতো পবিত্র স্থানেও জানাজার অনুমতি মেলেনি।

চিত্র: রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে মৃত্যু যখন পরম সত্য, তখন মানুষের শেষ বিদায়ের মুহূর্তগুলো হওয়া উচিত হানাহানি ও প্রতিহিংসামুক্ত।
এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান জরুরি
আমাদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসার বীজ এমন এক গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন মৃতদেহ নিয়েও নোংরা খেলা শুরু হয়েছে।
এই ধরনের সংস্কৃতি কোনোভাবেই একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।
একজন জাতীয় নেতার মৃত্যুতে সরকার বা প্রশাসন কেন এমন আতঙ্কিত হবে?
একটি জানাজা পড়াতে দিলে যদি কোনো সরকারের ক্ষমতার মসনদ নড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে সেই মসনদের ভিত্তি কতখানি ঠুনকো।
এই মানসিকতা থেকে আমাদের অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকতেই পারে,
কিন্তু মৃত্যুর দুয়ারে এসে সমস্ত বৈরিতা মুছে ফেলা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
বর্তমান প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এই ধরনের উগ্র ও সংঘাতময় আচরণ থেকে তারা যেন সরে আসেন।
সরকারের উচিত মানবিক দিক বিবেচনা করে অন্তত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নমনীয় ও উদার মনোভাব প্রদর্শন করা।
শেষ গন্তব্য চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে
ধানমন্ডিতে যখন জানাজা পড়তে দেওয়া হলো না এবং নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া হলো, তখন বাধ্য হয়ে মরদেহ দ্রুত
গ্রামের বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকার পাট চুকিয়ে কফিনটি সরাসরি তার পৈতৃক নিবাস চাটখানের রাউজান পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেখানেই পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে তার সর্বশেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর সব ধরনের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয়।
জন্মভূমি চাটখানের মাটি তাকে বুকে টেনে নিলেও রাজধানীর এই অমানবিক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
মৃত মানুষের জানাজা ঠেকানোর এই ঘৃণ্য মানসিকতা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
আগামীর বাংলাদেশ ও আমাদের প্রত্যাশা
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের বাঁচার যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই না যেখানে মৃত্যুর পরও মানুষকে দলীয় পরিচয়ে মাপা হয়।
প্রশাসনের এমন পক্ষপাতমূলক আচরণ দেশের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই সংকীর্ণ রাজনৈতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের প্রয়াণ ও তার জানাজাকে কেন্দ্র করে যা ঘটল, তা আমাদের বোধোদয়ের নতুন দুয়ার খুলে দিক।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি এই নগ্ন বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে না পারেন, তবে অন্ধকারের শক্তি দিন দিন আরও গ্রাস করবে।
সময় এসেছে এসব অন্ধকার সংস্কৃতিকে চিরতরে বিদায় জানানোর এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের।
