মিরপুরের জেনেভা ও পল্লবী বিহারি ক্যাম্পে বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার, ককটেল কারখানা ও দৈনিক গ্যাং–ওয়ার। বিএনপি নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নাশকতার নতুন ছক।
ঢাকার মিরপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও পল্লবী বিহারি ক্যাম্প—দুটি এলাকা এখন রাজধানীর নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ড হটস্পট। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এখানে গড়ে উঠেছে সংগঠিত অপরাধচক্র, বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার, ককটেল–কারখানা আর প্রতিনিয়ত গ্যাং–ওয়ারের ভয়ার্ত বাস্তবতা। তদন্তে উঠে এসেছে—বিএনপিপন্থী শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই দুটি ক্যাম্প রাজধানীর সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ আশ্রয়স্থল: কেন টার্গেট বিহারি ক্যাম্প?
গত বছরের ৫ আগস্টের সহিংসতার পর বহু সন্ত্রাসী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছেড়ে আশ্রয় নেয় জেনেভা ও পল্লবী ক্যাম্পে।
স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মিলে তারা তৈরি করে নতুন নেটওয়ার্ক—যেখানে রয়েছে:
- লুট হওয়া সরকারি এলএমজি, এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তল
- নিয়মিত মারামারি, খুন–গোলাগুলি
- ককটেল তৈরির স্থায়ী কারখানা
- মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির কেন্দ্র
নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ এখন এই দুই ক্যাম্পে প্রকাশ্যে ব্যবহার হচ্ছে।
জেনেভা ক্যাম্প: অস্ত্রের পাহাড়, ককটেল কারখানা এবং দুই সন্ত্রাসীর আধিপত্য
জেনেভা ক্যাম্পের বিভিন্ন বাসায় অস্ত্র মজুতের দৃশ্য এখন সাধারণ ব্যাপার।
কুখ্যাত দুই সন্ত্রাসী—বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম পুরো ক্যাম্পের অস্ত্রবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে।
জেনেভা ক্যাম্পে ৪ ও ৭ নম্বর সেক্টরে রয়েছে দুটি স্থায়ী ককটেল–কারখানা। এখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে: বোমা, হাতবোমা, উচ্চক্ষমতার ককটেল।
এর মূল কারিগর জসিম ওরফে কাল্লু, যে পল্লবী ক্যাম্পে থাকলেও অর্ডার পেলে জেনেভা ক্যাম্পে পাড়ি দেয়।
আরেক কারিগর কালা নবাব গ্রেপ্তার এড়াতে বাইরে ভাড়া বাসায় থাকে, কিন্তু ক্যাম্পভিত্তিক বিস্ফোরক উৎপাদনে নিয়মিত সক্রিয়।
বুনিয়া সোহেল ও তার ভাই টুনটুন ছোট আকারের বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভেতরে ককটেল তৈরির গোপন কিচেন গড়ে তুলেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে থাকা এসব কারখানা যে কোনো সময় বড় ধরনের নাশকতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পল্লবী বিহারি ক্যাম্প: সন্ত্রাসী তৎপরতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা
পল্লবী বিহারি ক্যাম্পের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
সরেজমিনে দেখা যায় খোলা গলিতে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা, নিয়মিত ছিনতাই, মাদক বিক্রি, কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য, রাতের অন্ধকারে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আদান–প্রদান। স্থানীয়দের অভিযোগ—এ ক্যাম্প সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের লোকজন।
বিশেষ করে: বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর বিএনপির শীর্ষ নেতা আমিনুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী “অপারেশন” পরিচালনা করছে।
পাশাপাশি ৯০–এর দশকের কুখ্যাত গ্যাংস্টার এবং বর্তমানে বিএনপি–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি পিচ্চি হেলাল মোহাম্মদপুর–বিহারি ক্যাম্প অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখছে।
ক্যাম্পবাসীদের আতঙ্ক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়তা
বহু বাসিন্দা জানান—ক্যাম্পের ভেতরে পুলিশ ঢোকার সাহস পায় না। এক নারী বলেন- “রাত হলে জানালা–দরজা বন্ধ করে বসে থাকি। ওরা কাউকে তুলে নিলেও আমরা কথা বলতে পারি না।”
এক দোকানদার জানান- “প্রতি মাসে চাঁদা দিতে হয়। না দিলে দোকানেই ককটেল মেরে দেবে।” অভিযানের পরও লুট হওয়া সরকারি অস্ত্রের সামান্য অংশই উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ।
রাজনৈতিক নাশকতার ছক: সামনে বড় সহিংসতার আশঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে—রাজধানীর মাঝে এত বড় অস্ত্রভাণ্ডার, কিশোর গ্যাং ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সমন্বয় সব মিলিয়ে এটি বড় ধরনের সহিংসতার পূর্বাভাস।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে বিএনপির নেতারা এই ক্যাম্পগুলোকে নাশকতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন—“গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযানে আছি। জেনেভা ক্যাম্পে কয়েকটি ককটেল কারখানার সন্ধান পেয়েছি।”
তবে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি
