জামায়াতপন্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আযমী ও কর্নেল হকের ভারত বিভক্তির হুমকি উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ২০২৬ নির্বাচন ঘিরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রশ্নের জন্ম।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে জামায়াতপন্থী দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার ভারতবিরোধী মন্তব্য ঘিরে। প্রাক্তন জামায়াত প্রধান গোলাম আযমের ছেলে ও সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী দাবি করেছেন— “ভারত ভেঙে টুকরো না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে শান্তি আসবে না।”
এ বক্তব্য শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিবেশেও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এদিকে আরও একধাপ এগিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আবদুল হক প্রকাশ্যে বলেছেন—ভারতের সেভেন সিস্টারকে পৃথক করে সাতটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করতে হবে। তাঁর দাবি, “এটাই হবে দক্ষিণ এশিয়ার স্থায়ী সমাধান।”

২০২৬ নির্বাচন ঘিরে উস্কানিমূলক বক্তব্য?
ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে আযমীর এই মন্তব্য সামনে আসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বিশেষত জামায়াত-এ-ইসলামীর সক্রিয়তা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের সময়ে এমন বক্তব্য বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে:
- এই বক্তব্য কি দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ানোর কৌশল?
- ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক দুর্বল করার উদ্দেশ্য কি?
- জামায়াতের আন্তর্জাতিক সংযোগ কি আবার সক্রিয় হচ্ছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পর কোণঠাসা জামায়াত এখনো সাংগঠনিকভাবে চাপে আছে। তাই আঞ্চলিক উত্তেজনা উস্কে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্পেস ফিরে পেতে চায় দলটির প্রভাবশালী অংশ।
ইউনুস ও সেনাপ্রধানের ‘ইঙ্গিত’ যুক্ত করার অভিযোগ
ঘটনাটিকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মদদ এবং সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামানের ‘সাইলেন্ট কনসেন্ট’-এর ইঙ্গিত পেয়েই এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন কিছু সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।
অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আন্তর্জাতিক মহল এমন বক্তব্যকে সংবেদনশীল ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা হিসেবে দেখছে।
ভারতের সেভেন সিস্টার নিয়ে হুমকি: পরিণতি কী হতে পারে?
কর্নেল হকের বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে—ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে পৃথক করে সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করলে “ভারতীয় হেজেমনি ভেঙে পড়বে”।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য—
- ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে,
- বাংলাদেশকেও অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে,
- আঞ্চলিক বাণিজ্য, সংযোগ, সীমান্ত সহযোগিতা—সবগুলোতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দিল্লির কূটনৈতিক মহল ইতিমধ্যে বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলে জানা গেছে, যদিও এখনো সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়নি।
বাংলাদেশ সরকারের সম্ভাব্য অবস্থান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে ভারত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে:
- ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন চুক্তি
- সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা
- বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ বিনিময়
- আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প
এই বাস্তবতায় আযমী–হকের বক্তব্য সরকারী অবস্থানের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। তাই নীতিনির্ধারকদের মতে এ ধরনের মন্তব্য রাষ্ট্রীয় অবস্থান প্রতিফলিত করে না, বরং এটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বক্তব্য।
কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে এসব বক্তব্য?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন:
- জামায়াতের পুনরুত্থান পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা
- ২০২৬ নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীলতা তৈরির মঞ্চ প্রস্তুতি
- অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা
- ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর চাপ সৃষ্টি করা
- আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বক্তব্য
উপসংহার
আযমী ও আবদুল হকের ভারত ভাঙার হুমকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতি—সবকিছুর মাঝেই এই বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সরকার যদি দ্রুত অবস্থান পরিষ্কার না করে, আন্তর্জাতিক মহলে এই আলোচনা আরও বড় আকার নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
