রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারে অস্ট্রিয়া–ফ্রান্স সফর করলেন সিজিএস লে. জেনারেল মিজান। পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে সেনাবাহিনী।
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (RNPP) নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পথে। এই নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক আণবিক নিরাপত্তা প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লে. জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম নেতৃত্ব দেন একটি উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফরে।
আইএইএ সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
৩০ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনের এই সফরে প্রতিনিধি দল প্রথমে ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক করেন। বৈঠকে রূপপুর প্রকল্পের:
- নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি রেজিম
- ফিজিক্যাল প্রোটেকশন সিস্টেম (PPS)
- জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা
- আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনে নিরাপত্তা সম্প্রসারণ
—এগুলো নিয়ে IAEA–এর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন ভিয়েনায় বাংলাদেশের ডিফেন্স অ্যাডভাইজার ব্রিগেডিয়ার রুবাইয়াত মাহমুদ হাসিব এবং দুইজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
ফ্রান্সে সামরিক–প্রযুক্তিগত সমন্বয় আলোচনা
অস্ট্রিয়া সফর শেষে দলটি ফ্রান্সে যান, যেখানে ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা বৈঠক করেন। যদিও আলোচনার সুনির্দিষ্ট বিষয় প্রকাশ করা হয়নি, ধারণা করা হচ্ছে রূপপুর নিরাপত্তা প্রযুক্তি, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম, জরুরি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নই ছিল মূল আলোচ্যসূচি।
রূপপুর প্রকল্প: দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রাশিয়ার রোসাটমের সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ব্যবস্থাপনায় নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের সর্ববৃহৎ প্রযুক্তিগত প্রকল্প। এতে রয়েছে:
- দুটি VVER-1200 রিঅ্যাক্টর
- মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট
- প্রকল্প ব্যয়: ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
২০১৭–১৮ সালে রিঅ্যাক্টর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিটের ফ্রেশ ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। ভারতের সহযোগিতায় প্রকল্পের মানবসম্পদ প্রশিক্ষণও চলমান।
যদিও ২০২৫ সালে প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল, এখন তা কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন আরও জোরদার হচ্ছে?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে আণবিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা। এতদিন:
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ সেল
- সীমিত PPS মডেল
—দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা করা হলেও এখন সেনাবাহিনীকে দেওয়া হচ্ছে পূর্ণ দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রূপপুর রিঅ্যাক্টর–১ চালু হওয়ার আগে নিরাপত্তা প্রটোকলে সামান্য শৈথিল্যও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। এজন্যই আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা ও সশস্ত্র টহল ব্যবস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী দ্রুত কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
সম্ভাব্য লাভ
- আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘মাল্টি-লেয়ারড’ নিরাপত্তা
- উন্নত মনিটরিং, নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া
- আণবিক জ্বালানি সুরক্ষায় সামরিক দক্ষতা যুক্ত হওয়া
- আইএইএ প্রোটোকল নিশ্চিত হওয়ায় বিদেশি আস্থা বৃদ্ধি
রূপপুর প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আর সেই ভবিষ্যৎকে আন্তর্জাতিক মানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর এই পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা দেশকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
