বেনাপোলে দুই মাস ধরে দেড় শতাধিক সুপারি ট্রাক আটকে আছে। রপ্তানিব্যাহত, দিনে ক্ষতি ৩ লাখ টাকা। ভারতীয় জটিলতা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগে অচলাবস্থা দীর্ঘ হচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলে প্রায় দুই মাস ধরে ১০০ কোটি টাকার সমমূল্যের দেড় শতাধিক রপ্তানিমুখী সুপারি ট্রাক আটকে আছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ট্রাকের জন্য দৈনিক গড়ে ২ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা মোট হিসাব অনুযায়ী দৈনিক প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যের মান পরীক্ষা, কাগজপত্র যাচাই এবং ইচ্ছাকৃত পণ্য জটিলতা তৈরির কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সুপারি রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম সুপারি উৎপাদক
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে সুপারি উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
মানসম্মত সুপারির কারণে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৭০০ কোটি টাকার সুপারি ভারতে রপ্তানি হয়। কিন্তু গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দরে দেড় শতাধিক ট্রাক আটকে থাকায় রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ট্রাক চালকদের মানবিক সংকট
দীর্ঘ অপেক্ষায় ট্রাক চালকদের ওপরও তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি।
আটকে থাকা ট্রাক চালক সোলাইমান বলেন:
“১ মাস ২৭ দিন ধরে এখানে আটকে আছি। খাবার, থাকার সমস্যা — সবকিছুতেই কষ্ট হচ্ছে। ওপারের ব্যবসায়ীরা সুপারির বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট করে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করছে বলে আমাদের সন্দেহ।”
ট্রাক চালকদের অভিযোগ, ভারতীয় পেট্রাপোল বন্দর ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে পণ্য খালাস করছে, ফলে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ: ভারতীয় সিন্ডিকেট সক্রিয়
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আউলিয়া এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম বলেন:
“পেট্রাপোল বন্দরে কৃত্রিমভাবে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। কখনো মান পরীক্ষা, কখনো কাগজপত্রের অজুহাতে সুপারি নিতে দেরি করছে।”
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশি সুপারির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ভারত সরকার একের পর এক রপ্তানি বিধিনিষেধ আরোপ করায় বর্তমান রপ্তানি মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
দুই দেশের সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে
বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন: বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর।
দ্রুত সরকারিভাবে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্রুত বাণিজ্যিক বৈঠক বা যৌথ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
সরকারি ব্যাখ্যায় ভিন্ন মত
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।
বেনাপোল বন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক আবু তালহা বলেন: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আমরা ১০,৬৫০ টন সুপারি রপ্তানি করেছি।
যে ট্রাকের কাগজপত্র আমাদের কাছে এসেছে, তা ভারতেই প্রবেশ করেছে।
তার দাবি, যেসব ট্রাক এখনো বন্দরে আছে, তার বেশিরভাগই ব্যবসায়ীদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি বা বিলম্বের কারণে আটকে রয়েছে।
সংকটের সমাধান কোথায়?
যৌথ বাণিজ্য বৈঠক, ভারতীয় পেট্রাপোলে পরীক্ষার সময়সীমা কমানো, সিন্ডিকেটবিরোধী ব্যবস্থা, বন্দর–পর্যায়ের দ্রুত সমন্বয়।
যদি ত্বরিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন—
➡ দেশের সুপারি রপ্তানির বড় অংশ স্থবির হয়ে পড়বে।
➡ রপ্তানিকারকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
➡ বাজার নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় সিন্ডিকেটের হাতে চলে যেতে পারে।
