বাংলাদেশে গত ১৬ মাসে ভয়াবহভাবে বেড়েছে গণপিটুনি। বিচারহীনতা, গুজব ও আইনের প্রতি আস্থাহীনতায় মব সন্ত্রাস রূপ নিচ্ছে প্রাণঘাতী সংকটে।
গণপিটুনি: মব সন্ত্রাসে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ
বিচারহীনতার অন্ধকারে ‘বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে’
বাংলাদেশে গত ১৬ মাসে মব সন্ত্রাস একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ, মাজার ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর হামলা, গণমাধ্যম কার্যালয়ে ভাঙচুর—এসবের পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে গণপিটুনি। চুরি, ছিনতাই কিংবা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগে মুহূর্তের মধ্যে গড়ে ওঠা মবের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই (জানুয়ারি–অক্টোবর) মব তৈরি করে ১৮৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় নিহত ৭২ জন—যা রাজধানীতেই সমস্যার গভীরতা তুলে ধরে।
পরিসংখ্যানের ভাষায় মব সন্ত্রাস
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) পরিসংখ্যান অনুযায়ী—
- ২০২৪: ১২৮ জন
- ২০২৫ (প্রথম ১১ মাস): ১৮৪ জন
চলতি বছরে বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকার পর চট্টগ্রাম (২৮), খুলনা (১৭), বরিশাল (১৪), রাজশাহী (১৩), ময়মনসিংহ (১০), রংপুর (৭) ও সিলেট (৪)।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও সহিংসতার উত্থান
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পট পরিবর্তনের পর গণপিটুনিতে হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আদালত প্রাঙ্গণেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে—যেখানে সাবেক মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে বিচারক পর্যন্ত হামলার শিকার হয়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় আইনের শাসনের প্রতি আস্থা কমে গিয়ে মবের হাতে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
আলোচিত কয়েকটি ঘটনা
ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যা
ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। পুলিশ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়নি। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা। কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় বিচার নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।
রংপুরের তারাগঞ্জে দুইজন নিহত
চোর সন্দেহে রূপলাল ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও গ্রেপ্তাররা দ্রুত জামিনে মুক্ত হন। তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও অনাস্থা বাড়ছে।
মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে হত্যাকাণ্ড
ঢাকায় এক ব্যবসায়ীকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ হলেও সময়ের সঙ্গে তদন্তে স্থবিরতা দেখা যায়। প্রধান অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও স্পষ্ট হয়।
কেন বাড়ছে গণপিটুনি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে—
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি
- গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্যের বিস্তার
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা বিলম্ব
- আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা
যখন অপরাধের বিচার দৃশ্যমান হয় না, তখন মব আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে—এমনটাই মত মানবাধিকার কর্মীদের।
করণীয় কী?
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—
- প্রতিটি গণপিটুনির ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা
- গুজব প্রতিরোধে ডিজিটাল মনিটরিং ও সচেতনতা
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক করা
গণপিটুনি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। বিচারহীনতা চলতে থাকলে মব সন্ত্রাস আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আইন প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে, সত্যিই ‘বিচারের বাণী নীরবে কাঁদবে’—আর প্রাণ যাবে নিরীহ মানুষের।
