আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন আয়োজন গণতন্ত্রের প্রহসন বলে মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনা। ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে দমননীতির অভিযোগ।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ও বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে। প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত সরকার ছাড়াই অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে দেশ পরিচালিত হওয়ায় গণতান্ত্রিক বৈধতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে গার্ডিয়ান ও নিউজএক্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত নির্বাচনকে “গণতন্ত্রের প্রহসন” হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, দেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখে কোনো ভোটই গণতান্ত্রিক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
নির্বাচন নিয়ে তীব্র আপত্তি
শেখ হাসিনা বলেন, “যে সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তারা আইন পরিবর্তন করে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করছে। এটি প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দমন করার নামান্তর।” তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র কিনতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনে আমাদের মোকাবিলার সৎসাহস নেই বলেই তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দমাতে চায়।”
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরেন। ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস ও নরসিংদীতে চঞ্চল ভৌমিক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সরকারের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।
তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার উগ্রপন্থীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদের মুক্তি দিয়ে সংখ্যালঘু ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। “রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ,”—বলেন শেখ হাসিনা।
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন
শেখ হাসিনার দাবি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বর্তমানে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু এখন সেই মূল্যবোধ হুমকির মুখে।”
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব দেশের সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করছে।
অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের আমলে বাংলাদেশ ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল।
দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “এখন বিনিয়োগ স্থবির, আমদানি-রপ্তানি কমেছে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।
জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া শাসন করলে এমন সংকট অনিবার্য।”
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
একদিকে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বলছে, অন্যদিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবৈধ ও দমনমূলক বলে আখ্যা দিচ্ছে।
এই অবস্থায় নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে নজর বাড়ছে।
