‘গোপন বৈঠক’ ফাঁসের পর ভারত ইস্যুতে সুর নরম করেছে জামায়াত। নির্বাচনী ইশতেহার ও আমিরের বক্তব্যে প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা। বিস্তারিত পড়ুন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত -জামায়াত সম্পর্ক। দীর্ঘকাল ধরে ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানে এক নাটকীয় নমনীয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি দলটির আমিরের দেওয়া বক্তব্য এবং নির্বাচনী ইশতেহার -এ ভারতকে দেওয়া বিশেষ গুরুত্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতূহল ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জামায়াত কি সত্যিই তাদের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসছে, নাকি এটি নিছকই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি কৌশলগত পরিবর্তন?
‘গোপন বৈঠক’ ও ফেসবুকের ব্যাখ্যা
জামায়াতের এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং পরবর্তীতে ভারতীয় গণমাধ্যমে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকদের ‘গোপন বৈঠকের’ খবর প্রকাশিত হয়।
এই খবর ফাঁসের পর গত ১ জানুয়ারি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, অসুস্থতা কাটিয়ে ফেরার পর অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের মতো ভারতের দুজন প্রতিনিধিও তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। তবে এটিকে ‘গোপন বৈঠক’ বলায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ভবিষ্যতে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বৈঠক হলে তা প্রকাশ্যেই হবে। এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা ভারতের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের ‘বরফ গলা’ শুরু হিসেবে দেখছেন।
২৬ দফার নির্বাচনী ইশতেহার ও পররাষ্ট্রনীতি
গত ৪ ফেব্রুয়ারি বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ ঘোষণা করে। ২৬ দফার এই ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে ‘পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে’ কাজ করতে চায়।
যেখানে আগে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ শব্দবন্ধটি বারবার ব্যবহৃত হতো, সেখানে এখন ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’ ও ‘সহযোগিতা’ শব্দগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে।
পুরোনো সুর বনাম নতুন সুর: এক বৈপরীত্য
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে গত এক বছরে যে পরিবর্তন এসেছে তা চোখে পড়ার মতো।
বিগত দিনের অবস্থান: গত বছরের মার্চে দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছিলেন যে, ভারত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
বর্তমান অবস্থান: টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “জামায়াত কখনোই ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি।
” তিনি আরও যোগ করেন যে, ‘কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’—এটাই এখন জামায়াতের আন্তর্জাতিক নীতির মূল ভিত্তি।
জামায়াতের অবস্থান পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র
| বিষয় | অতীতের অবস্থান (২০২৪-এর আগে) | বর্তমান অবস্থান (২০২৬ নির্বাচন কেন্দ্রিক) |
| শব্দচয়ন | ভারতীয় আগ্রাসন, ষড়ষন্ত্র। | পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব। |
| বৈঠক | প্রকাশ্য বিরোধিতা ও দূরত্ব। | কূটনীতিকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আলোচনা। |
| পররাষ্ট্রনীতি | কট্টর জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরোধ। | আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। |
| আদর্শিক ব্যাখ্যা | ভারতকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করা। | ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বন্ধু ভাবা। |
বিশ্লেষকদের অভিমত: কেন এই পরিবর্তন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই নমনীয় সুরের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন,
জামায়াত এখন তিনটি ফ্রন্টে কাজ করছে:
১. ভাসমান ও তরুণ ভোটার: তরুণ প্রজন্ম উগ্র ভারতবিদ্বেষের চেয়ে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের আকৃষ্ট করতে জামায়াত তাদের ভাষায় আধুনিকতা ও নমনীয়তা আনছে।
২. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: ক্ষমতা বা রাষ্ট্রের অংশীদার হতে গেলে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর সমর্থন বা অন্তত ‘নিরপেক্ষতা’ প্রয়োজন।
৩. জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে জামায়াত নিজেকে একটি ‘দায়িত্বশীল’ দল হিসেবে বিশ্বদরবারে পেশ করতে চাইছে।
ঐতিহাসিকভাবে ভারতের ভূমিকা ও জামায়াত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার সপক্ষে জামায়াতের অবস্থান ছিল তাদের ভারতবিরোধী রাজনীতির আদি ভিত্তি।
পরবর্তীতে গঙ্গা-তিস্তা পানি চুক্তি, সীমান্ত হত্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগকে পুঁজি করে দলটি বাংলাদেশে তাদের জনসমর্থন জোরালো করার চেষ্টা করেছে।
তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে দলটি বুঝতে পারছে যে, ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বৈরিতা বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
শেষ কথা;
জামায়াতে ইসলামীর এই ‘কৌশলগত নমনীয়তা’ শেষ পর্যন্ত কতটুকু স্থায়ী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের এই বার্তা যদি কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য হয়, তবে নির্বাচনের পর আবার সম্পর্কের অবনতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
তবে দলটি যদি সত্যিই তাদের আন্তর্জাতিক নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আনে, তবে তা বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় ঘটাবে।
