ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় ভোটার উপস্থিতি মাত্র ২৪% হলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দাবি সারাদেশে প্রায় ৪৮%। এই বিশাল তথ্যের অমিল ও ভোট কারচুপির অভিযোগ নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট।
ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে এক আকাশ-পাতাল ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন কমিশন দুপুর ২টা পর্যন্ত সারাদেশে গড়ে প্রায় ৪৭.৯১% ভোট পড়েছে বলে দাবি করলেও, রাজধানীর চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, ঢাকার আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার গড়ে মাত্র ২৩-২৪ শতাংশের আশেপাশে।
রাজধানীর মতো জনবহুল এলাকায় যেখানে ভোটারের উপস্থিতি নামমাত্র, সেখানে সারাদেশে প্রায় অর্ধেক ভোট পড়ে যাওয়ার এই তথ্যে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম বিস্ময় ও বিতর্ক।
ইসির দাবি বনাম ঢাকার বাস্তব চিত্র
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ২টা পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ১২.৭৭ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬ কোটির বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ কমিশন দাবি করছে যে, অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। তবে রাজধানীর ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ আসনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ কেন্দ্রই ছিল প্রায় ভোটারশূন্য।
বিডিডাইজেস্ট এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আসনগুলোতে দুপুর/বিকাল পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতির প্রকৃত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
ঢাকা মহানগরের আসনভিত্তিক ভোটের খতিয়ান
| আসনের নাম | মোট ভোটার | প্রদত্ত ভোট (আনুমানিক) | উপস্থিতির হার (%) |
| ঢাকা-৪ | ৩,৫৮,০০০ | ৮৯,৬৭১ | ২৫% |
| ঢাকা-৫ | ৪,১৫,৪৫৫ | ১,০৩,০০০ | ২৫% |
| ঢাকা-৬ | ২,৮৯,৪৩৫ | ৭২,৩৫৯ | ২৫% |
| ঢাকা-৭ | ৪,৭৬,১৬৭ | ৯৫,২৩৩ | ২০% |
| ঢাকা-৮ | ২,৬৬,৪৮১ | ৭৪,৬১৫ | ২৮% |
| ঢাকা-৯ | ৪,৬৩,৪৩৭ | ১,১১,২২৫ | ২৪% |
| ঢাকা-১০ | ৩,৮২,২০৮ | ৮০,২৬৪ | ২১% |
| ঢাকা-১১ | ৪,৩৪,২৯৬ | ৮২,৫১৬ | ১৯% |
| ঢাকা-১২ | ৩,২৮,৮২৮ | ৬২,৪৭৭ | ১৯% |
| ঢাকা-১৪ | ৫,০০,৭৪৩ | ১,২০,১৭৮ | ২৪% |
| ঢাকা-১৬ | ৩,৯৬,১৯০ | ৭৯,২৩৮ | ২০% |
| ঢাকা-১৭ | ৩,২৭,৮৮৭ | ৭২,১৩৫ | ২২% |
| ঢাকা-১৮ | ৬,০৫,৪৪৯ | ২,০৫,৮৫৩ | ৩৪% |
| মোট গড় | ৫২,৪৫,০০০ | ১২,৪৯,০০০ | ২৩.৮% |
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ১৩টি আসনে গড় উপস্থিতির হার মাত্র ২৩.৮%। এমনকি সর্বোচ্চ হার দেখানো ঢাকা-১৮ আসনেও তা ৩৪ শতাংশের নিচে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে যেখানে হাহাকার, সেখানে ঢাকার বাইরে কোন জাদুবলে ৪৮ শতাংশ ভোট পড়ল?
মাঠপর্যায়ের চিত্র: খালি কেন্দ্র ও ‘ভুতুড়ে’ ভোট
সকাল থেকেই রাজধানীর অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটারের দেখা মেলেনি। অনেক কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অলস সময় পার করতে দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ঘণ্টায় ১০-১৫ ভোট: অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে দেখা গেছে, প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫টি করে ভোট পড়েছে। অথচ ইসির দেওয়া তথ্যের সাথে মিলালে এই হার অন্তত তিনগুণ বেশি হওয়ার কথা ছিল।
ভিডিও প্রমাণের আধিক্য: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্রের বাইরে লাইন নেই এবং বুথের ভেতরে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বাইরে কেউ নেই।
ঢাকার বাইরেও একই চিত্র: পর্যবেক্ষণ বলছে, ঢাকার মতো দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সারাদেশে একযোগে উচ্চ উপস্থিতির দাবি করছে, যাকে পর্যবেক্ষকরা ‘ম্যানিপুলেশন’ বা তথ্যের বিকৃতি হিসেবে দেখছেন।
কেন এই তথ্য বিভ্রাট? কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া সত্ত্বেও কমিশন উচ্চহার দেখাচ্ছে মূলত নির্বাচনের বৈধতা প্রমাণের জন্য। কোনো নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ২৫ শতাংশের নিচে থাকা মানে হলো সেই নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থার চরম অভাব।
সুষ্ঠু নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী এক বিশেষজ্ঞের মতে, “ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যদি ২০-২৪ শতাংশ ভোট পড়ে, তবে পুরো দেশের গড় ৪৮ শতাংশ হওয়া গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব। যদি না গ্রামীণ অঞ্চলে কোনো ‘অদৃশ্য’ শক্তি ব্যালটে সীল মেরেছে।”
ইতিমধ্যেই এই অসংগতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। নেটিজেনরা ব্যঙ্গ করে একে নির্বাচন কমিশনের ‘আষাঢ়ে গল্প’ বলে অভিহিত করছেন। তথ্যের এই লুকোচুরি নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আবারও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জনগণের দাবি: স্বাধীন যাচাই-বাছাই
এই বিশাল তথ্যের গরমিল নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি তুলেছেন: ১. নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। ২. আসনভিত্তিক কেন্দ্রওয়ারী ভোটের তথ্য অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ৩. কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে প্রকৃত উপস্থিতির প্রমাণ দিতে হবে।
উপসংহার: গণতন্ত্রে জনগণের সম্মতিই শেষ কথা। কিন্তু যদি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জনগণের সেই অসম্মতিকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। ঢাকার ২৩.৮% আর ইসির ৪৮%—এই দুই তথ্যের মাঝখানে যে বিশাল শূন্যস্থান, তা পূরণ করার দায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনেরই।
