নিজের ভোট দিতে পারলেন না ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও জাল ভোটের অভিযোগ
ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, নজিরবিহীন অনিয়ম আর ‘ভুতুড়ে’ ভোটের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের নির্বাচন ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কারণে—যেখানে স্বয়ং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাদ আলী নিজের ভোটটি দিতে পারেননি।
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা রাজধানীতে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অসংখ্য অভিযোগের মাঝে খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই এক বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নিজের ভোট হারালেন ডিএমপি কমিশনার: কী ঘটেছিল কেন্দ্রে?
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোটের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গতকাল নির্বাচনের দিন সকালে ডিএমপি কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাদ আলী তাঁর নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যান। তবে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর প্রিজাইডিং অফিসার ও দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাঁকে যে তথ্য দেন, তাতে তিনি নিজেও হতবাক হয়ে যান। দেখা যায়, তাঁর নামের বিপরীতে ব্যালট পেপার ইস্যু হয়ে গেছে এবং ভোটটি ইতিমধ্যে প্রদান করা হয়েছে।
অর্থাৎ, রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক যখন নিজেই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না, তখন সাধারণ ভোটারদের অবস্থা কী হতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়। এই ঘটনাটি রাজধানীর প্রতিটি সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য: “আমার ভোট কে দিল?”
ভোট দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ভোটকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডিএমপি কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাদ আলী।
দৃশ্যত ক্ষুব্ধ ও বিব্রত কমিশনার সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন:“আমি একজন নাগরিক হিসেবে আমার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে এসেছিলাম।
কিন্তু এখানে এসে জানতে পারলাম আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।
যদি ঢাকা শহরের নিরাপত্তা প্রধানের ভোটই সুরক্ষিত না থাকে, তবে এই ব্যবস্থার ওপর মানুষ কীভাবে আস্থা রাখবে? এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং অগ্রহণযোগ্য।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, পুরো ঢাকা শহরে যেখানে পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল, সেখানে কীভাবে এমন ‘প্রক্সি ভোট’ সম্ভব হলো, তা নিয়ে তিনি বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেবেন।
তবে নির্বাচনের দিনে এমন বক্তব্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বকেও জনমনে বির্তকিত করেছে।
‘প্রক্সি’ ভোটের মহোৎসব: একজন ভোটারের ভোট দিচ্ছে অন্যজন
কেবল ডিএমপি কমিশনারই নন, ঢাকার প্রায় প্রতিটি আসনেই একই ধরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখছেন তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন দুপুর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন আসন থেকে আসা তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩০% ভোটার কেন্দ্র থেকে ফিরে গেছেন কারণ তাদের ভোট ‘অন্য কেউ’ দিয়ে দিয়েছিল।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। অনেক জায়গায় বুথের ভেতরে পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতেই জাল ভোট দেওয়ার উৎসব চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিসিটিভি ক্যামেরায় অনেক কেন্দ্রে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ব্যালট পেপারে দেদারসে সীল মারার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
কলঙ্কিত এক অধ্যায় ও গণতান্ত্রিক সংকট
২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক ‘গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
যেখানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দিন শেষে বড় অংকের ভোটার উপস্থিতির দাবি করছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
খোদ ডিএমপি কমিশনারের ভোট দিতে না পারার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি একটি পরিকল্পিত কারচুপির অংশ ছিল।
বিগত কয়েক দশকের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জাল ভোট বা কারচুপি কোনো নতুন বিষয় নয়।
তবে প্রশাসনের শীর্ষ পদের একজন ব্যক্তির ভোটাধিকার হরণ হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরেও এসেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে এই অনিয়ম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
শেষকথা
ডিএমপি কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাদ আলীর এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আসলে দেশের কোটি কোটি ভোটারের প্রতিচ্ছবি।
যখন রাষ্ট্রের রক্ষকই ভুক্তভোগী হন, তখন বিচারহীনতা আর অনিয়মের শিকড় কত গভীরে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই কলঙ্কিত নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো তিলক হয়ে থাকবে, যা মুছতে দীর্ঘ সময় ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রয়োজন।
