ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলে বড় গড়মিল পেয়েছে টিবিএস। রাজশাহী-৪ আসনে ভোট কাস্টিং ২৪৪% এবং নেত্রকোনায় ভোটারের চেয়েও বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা– সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে একযোগে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটে দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রকাশিত গণভোটের ফলাফল ও হিসাব বিশ্লেষণ করে ভয়াবহ সব অসঙ্গতি ও বড় ধরণের গড়মিল খুঁজে পেয়েছে গণমাধ্যম। কোথাও মোট ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে, আবার কোথাও কাস্টিং ভোটের হার দেখানো হয়েছে গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা: মোট ফলাফল
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্যমতে, এবারের গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন।
এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৬০.২৬ শতাংশ। প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ‘হ্যাঁ’ এবং ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন।
অর্থাৎ প্রায় ৬২.৪৭ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন।
তবে এই বিশাল জয়ের পরিসংখ্যানের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে কেন্দ্রভিত্তিক তথ্যের ব্যাপক অসংগতি।
রাজশাহী-৪: ভোট কাস্টিং ২৪৪ শতাংশ!
ইসির তথ্যে সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে রাজশাহী-৪ আসনে। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯ জন।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নথিতে সেখানে মোট ভোট কাস্ট দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩টি, যা শতাংশের হিসেবে ২৪৪.২৯৫ শতাংশ।
অর্থাৎ মোট ভোটারের চেয়েও ৪ লাখ ৬১ হাজার বেশি ভোট পড়েছে এই আসনে।
এই অবাস্তব পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, ‘না’ ভোট পড়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার ২২৯টি এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮২টি।
উল্লেখ্য, এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আবদুল বারী সরদার।
নেত্রকোনায় ভোটারের চেয়েও বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট
গড়মিলের চিত্র নেত্রকোনার তিনটি আসনেই (৩, ৪ ও ৫) প্রকট।
নেত্রকোনা-৩: এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন। অথচ শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ ভোটই পড়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৮টি।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, কমিশনের তথ্যে আবার ওই আসনের মোট প্রদত্ত ভোট দেখানো হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৮টি (৫৬.৬৫৯ শতাংশ)।
নেত্রকোনা-৪ ও ৫: এই দুই আসনেও একইভাবে তথ্যের অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে যেখানে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা মোট ভোটারের তুলনায় বেশি।
সিরাজগঞ্জে রহস্যজনক কম ভোট
সিরাজগঞ্জ-১ আসনে আবার দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৬০.৮৩ শতাংশ ভোট পড়লেও গণভোটে কাস্টিং দেখানো হয়েছে মাত্র ৭.৮৯৯ শতাংশ।
সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা ১ লাখ ১৬ হাজার ৬১৩ ভোট পেয়ে জয়ী হলেও গণভোটের এই বিশাল ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পার্বত্য জেলা ও গোপালগঞ্জে ‘না’-এর আধিপত্য
দেশজুড়ে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। যার মধ্যে পার্বত্য তিন জেলা ও গোপালগঞ্জের তিনটি আসনই রয়েছে।
গোপালগঞ্জ: আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ-১, ২ ও ৩ আসনের প্রতিটিতেই ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে ‘না’ ভোট প্রায় তিনগুণ বেশি পড়েছে।
পার্বত্য জেলা: খাগড়াছড়িতে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে ১১ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে।
রাঙামাটিতে ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ১০৬টি। বান্দরবানেও ১৮ হাজার ৭৩৯টি বেশি ‘না’ ভোট রেকর্ড করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ-১, সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রাম-৮ ও ১২ আসনেও ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, ‘না’ জয়ী ১১টি আসনের মধ্যে ১০টিতেই জয়ী সংসদ সদস্যরা বিএনপির মনোনীত।
বিশেষজ্ঞ মহলের উদ্বেগ
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যে এমন গাণিতিক ভুল ও অবাস্তব সংখ্যা নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) সর্বপ্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে একটি আসনে ভোটার সংখ্যার চেয়েও ৪ লাখের বেশি ভোট কাস্ট দেখানো হয়, সেখানে পুরো জাতীয় ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ইসির ডাটা এন্ট্রিতে যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে এই বিভ্রান্তি, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
