গাইবান্ধা সদরে নির্মমভাবে খুন হলেন আইনজীবী সহকারী সুজন কুমার সাহা। কুড়ালের আঘাতে খুনের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক। সংখ্যালঘু নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে বিচার চেয়েছে পরিবার।
নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা: গাইবান্ধা সদর উপজেলায় এক নির্মম ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্য সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির কাছেই দুর্বৃত্তদের কুড়ালের আঘাতে নিহত হয়েছেন সুজন কুমার সাহা (৩৮) নামে এক ব্যক্তি। তিনি পেশায় গাইবান্ধা জজ কোর্টের একজন আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
যেভাবে ঘটে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড
নিহত সুজন কুমার সাহা গাইবান্ধা সদর উপজেলার খামার বল্লমঝাড় এলাকার মৃত নিরঞ্জন চন্দ্র সাহার পুত্র। স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে সুজন কুমার সাহা তার নিজ বাসা থেকে স্থানীয় বাজারের উদ্দেশ্যে বের হন।
পথিমধ্যে দুইজন অপরিচিত ব্যক্তি ‘গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে’ বলে তাকে ডেকে থামায়। কথা বলার ছলে তাকে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে সাহার বাজার দক্ষিণ পাশে খামার বল্লমঝাড় এলাকার একটি ইটভাটার (মরহুম সরোয়ারের ভাটা) পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোমাত্রই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা তাদের সাথে থাকা কুড়াল দিয়ে সুজনের মাথায় অতর্কিত ও উপর্যুপরি আঘাত করে। কুড়ালের আঘাতে সুজন কুমার সাহার মাথা ও ঘাড় মারাত্মক জখম হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
তাকে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
উদ্ধার ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনাস্থলে গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে স্থানীয়রা রক্তাক্ত সুজনকে উদ্ধার করেন।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে পথেই তার মৃত্যু হয়।
একজন জজ কোর্টের আইনজীবী সহকারীর এমন আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে গাইবান্ধা আদালত পাড়া এবং তার নিজ এলাকায় শোকের মাতম শুরু হয়।
নিরাপত্তাহীনতায় হিন্দু সম্প্রদায়
হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা এবং নিহতের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তাদের দাবি, কোনো পূর্ব শত্রুতা ছাড়াই পরিকল্পিতভাবে সুজনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তাদের মতে, একের পর এক সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তারা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তারা এই ঘটনার সাথে জড়িত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশি পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি
গাইবান্ধা সদর থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন:
“আমরা ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ তদন্ত চালাচ্ছি। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
বিভিন্ন মহলের নিন্দা ও দাবি
সুজন কুমার সাহার খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন সোচ্চার হয়েছে।
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের জোর দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
তারা বলছেন, যদি দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তার করা না হয় তবে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক দূর হবে না।
উপসংহার
সুজন কুমার সাহার হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সাধারণ খুন নয়, এটি একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দেওয়া এবং একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি সঞ্চার করার অপপ্রয়াস।
প্রশাসনের উচিত হবে দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে দোষীদের গ্রেপ্তার করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
