সিলেট-৫ আসনের কানাইঘাটে ভোটার সংখ্যার চেয়েও ২১৬টি ভোট বেশি পড়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ১০৮.৫% ভোট কাস্টিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় ও ক্ষোভ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট: সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে এক অবিশ্বাস্য ও গাণিতিকভাবে অসম্ভব চিত্র ফুটে উঠেছে। কানাইঘাট পৌরসভার একটি ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটারের চেয়েও ২১৬টি ভোট বেশি পড়ার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী ওই কেন্দ্রে ভোট পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ১০৮.৫ শতাংশ, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: যখন ভোটার চেয়ে ভোট বেশি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত ‘ইউনিয়ন ভিত্তিক ফলাফল বিবরণী’ শিট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কানাইঘাট পৌরসভার ৪ নম্বর ক্রমিকে থাকা ‘রায়গড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (মহিলা)’ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৫৩৮ জন। তবে বিস্ময়করভাবে ওই কেন্দ্রের ফলাফলের কলামে মোট কাস্ট (প্রদত্ত ভোট) সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৭৫৪টি। অর্থাৎ, তালিকায় থাকা ভোটারের চেয়েও ১০৮.৫ শতাংশ ভোট বেশি কাস্ট হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়
এই ‘ভৌতিক’ ফলাফল বিবরণী ভাইরাল হওয়ার পর থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। ভোটার তালিকার চেয়ে বেশি ভোট পড়ার এই ঘটনাকে অনেকেই ‘ব্যালট ডাকাতি’ বা ‘প্রশাসনিক অদক্ষতা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, যেখানে মৃত বা প্রবাসী ভোটারদের কারণে সাধারণত ৮০-৯০ শতাংশ ভোট পড়াই কঠিন, সেখানে ১১০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়া স্পষ্টত জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও হাস্যরস
রায়গড় এলাকার একজন সাধারণ ভোটার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা জানতাম গায়েবি মামলায় মানুষ আসামি হয়। এখন দেখছি গায়েবি মানুষ ভোটও দেয়। নির্বাচন ব্যবস্থার কফিনে এর মাধ্যমে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাইঘাটের এক সচেতন নাগরিক বলেন, হয় ব্যালট বাক্স ভরাতে গিয়ে কোনো বাছবিচার না করেই সিল মারা হয়েছে, নয়তো দায়িত্বরত কর্মকর্তারা যোগ-বিয়োগের ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন।
নির্বাচন কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এই অসংগতির বিষয়ে জানতে কানাইঘাট উপজেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জেলা নির্বাচন অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এটি ‘টাইপিং মিস্টেক’ বা করণিক ভুল হতে পারে।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, এমন ভুল নির্বাচনের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের অভিমত
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ১০০ শতাংশ ভোট পড়া গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
সেখানে ১০৮ শতাংশ ভোট পড়া কেবল একটি সংখ্যাগত ভুল নয়, বরং এটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গলদকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা অবিলম্বে এই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
| বিষয় | পরিসংখ্যান |
| কেন্দ্রের নাম | রায়গড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (মহিলা) |
| মোট ভোটার | ২,৫৩৮ জন |
| প্রদত্ত ভোট (ইসির শিট অনুযায়ী) | ২,৭৫৪ টি |
| অতিরিক্ত ভোট | ২১৬ টি |
| ভোট পড়ার হার | ১০৮.৫% |
উপসংহার
সিলেট-৫ আসনের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন কেন্দ্র নয়, বরং এটি সারা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
ভোটারদের দাবি, অবিলম্বে এই অসংগতির ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে নির্বাচনের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
