নির্বাচিত ৭০ আসনের ২১.৪ শতাংশে জাল ভোটের তথ্য পেয়েছে টিআইবি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ।
৭০ আসনের ২১.৪% এ জাল ভোটের তথ্য: টিআইবি
নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামা ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
নমুনাভিত্তিক গবেষণার ফল
ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৭০টি আসন নির্বাচন করা হয়। ওই নমুনাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোটের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এর অর্থ এই নয় যে ২১ শতাংশ আসনে বা জাতীয়ভাবে ২১ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে। আমরা সেটি বলছি না। বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি নির্দিষ্ট নমুনা আসনের পর্যবেক্ষণ-নির্ভর তথ্য, যা সামগ্রিক নির্বাচনের একটি চিত্র তুলে ধরে।
সংসদ সদস্যদের ঋণ ও সম্পদ বিশ্লেষণ
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্ধেক সদস্যের দায় বা ঋণ রয়েছে। সদস্যদের মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা—যা গত চারটি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ।
দলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ সদস্যের দায় বা ঋণ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রার্থীদের হলফনামাভিত্তিক তথ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ত্রয়োদশ সংসদেও ব্যবসায়ী পেশার প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৬০ শতাংশ।
যদিও দ্বাদশ সংসদের তুলনায় এ হার ৫ শতাংশ কমেছে, তবে নবম সংসদের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
এ নিয়ে টিআইবি মনে করে, রাজনীতিতে ব্যবসায়ী প্রভাবের ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। এটি নীতি প্রণয়ন ও আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
নির্বাচনী অনিয়ম ও প্রশাসনিক ভূমিকা
প্রতিবেদনে নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসন ও
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকেই সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করার মূল্যবোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে আচরণবিধি মানতে অনীহা দেখিয়েছেন বলে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অসহযোগিতামূলক মনোভাবও দৃশ্যমান ছিল বলে দাবি টিআইবির।
প্রার্থীদের নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রমের প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
সার্বিক মূল্যায়ন
টিআইবির মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে।
আচরণবিধি প্রতিপালন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনের মানোন্নয়ন কঠিন হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, টিআইবির পর্যবেক্ষণ একটি নাগরিক সংগঠনের গবেষণালব্ধ মতামত,
যা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া জানা গুরুত্বপূর্ণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে টিআইবির এ প্রতিবেদন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
