বরিশালে আদালত কক্ষে তাণ্ডব ও মব জাস্টিস নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদের কঠোর অবস্থান। আইনের শাসন বজায় রাখতে সরকারের জিরো টলারেন্স।
বিশেষ প্রতিবেদক | বরিশাল: বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সম্প্রতি এক নতুন কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। বরিশাল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনা কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে আলোচনার ঝড়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিন দেওয়ার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে একদল আইনজীবীর আদালতের ভেতর ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদ বারবার ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।
বরিশালের আদালত কক্ষে যা ঘটেছিল
প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালত সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে। নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত যখন জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন, তখন সেখানে উপস্থিত একদল আইনজীবী উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারা বিচারকের খাস কামরার সামনে স্লোগান দেন এবং এক পর্যায়ে এজলাসের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মতে, আইনের রক্ষক হয়ে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন, তা দেশের বিচারিক ব্যবস্থার জন্য একটি বিপজ্জনক সংকেত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদের কঠোর অবস্থান
বিএনপি সরকার গঠনের পর পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে সালাউদ্দীন আহমেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, দেশে আর কোনো মব জাস্টিস চলতে দেওয়া হবে না। তার ভাষ্যমতে:
“আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কেউ যদি মনে করেন রাস্তায় বা আদালতে প্রভাব খাটিয়ে বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবেন, তবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
মন্ত্রীর এই ঘোষণার পরও বরিশাল আদালতে আইনজীবীদের এমন আচরণ সরকারের সদিচ্ছাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি নিজ দলের পরিচয়ে চলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে ‘মব জাস্টিস’ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মব জাস্টিস: গণতন্ত্রের জন্য এক বড় হুমকি
মব জাস্টিস বা জনরোষের মাধ্যমে বিচার কার্যকর করার প্রবণতা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যখন আদালতের চৌকাঠে এসে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বরিশালের ঘটনায় দেখা গেছে, আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে পেশিশক্তির ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলছে।
আইনজীবীদের ভূমিকা ও নৈতিকতা
আইনজীবীরা হলেন আদালতের কর্মকর্তা। তাদের কাজ আইনি যুক্তির মাধ্যমে মক্কেলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু যখন তারা নিজেরাই তাণ্ডবে জড়িয়ে পড়েন, তখন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বরিশালের ঘটনার পর সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির কারণে পুরো আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সরকারের পরবর্তী করণীয় ও জনআকাঙ্ক্ষা
সালাউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন প্রমাণ করতে হবে যে তাদের হুঁশিয়ারি কেবল কথার কথা নয়।
বরিশালের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
- সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ: আদালত কক্ষের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিশৃঙ্খলাকারীদের শনাক্ত করা।
- বার কাউন্সিলের পদক্ষেপ: অভিযুক্ত আইনজীবীদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
- নিরাপত্তা জোরদার: আদালত চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন নিশ্চিত করা।
আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে মব জাস্টিসের কোনো স্থান হতে পারে না।
আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি—অপরাধীর বিচার হবে আদালতে, রাজপথে বা এজলাসের ভেতরে তাণ্ডব চালিয়ে নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায় সাধারণ মানুষ।
বরিশালের ঘটনাটি সরকারের জন্য একটি অ্যাসিড টেস্ট; এখানে সফল হলে আইনের শাসন সুসংহত হবে, অন্যথায় মব জাস্টিসের এই বিষবৃক্ষ সমাজকে গ্রাস করবে।
