সুবিদপুর ছাত্রলীগের নেতার বাবার জানাজায় ডান্ডাবেড়ি পরে উপস্থিতি। শোকাতুর মুহূর্তে এই অমানবিক আচরণ ও প্যারোলে মুক্তির আইনি প্রয়োগ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বিশেষ প্রতিবেদক | চাঁদপুর/কুমিল্লা। মৃত্যু চিরন্তন, কিন্তু মৃত্যুর শোক যখন অপমানের শিকলে বন্দি হয়, তখন তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি রাষ্ট্রের বিবেক ও মানবিকতার পরিমাপক। সম্প্রতি সুবিদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এক রাজনৈতিক কর্মীর বাবার জানাজায় অংশগ্রহণের একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা নাগরিক সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী না হওয়া সত্ত্বেও, কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাবার জানাজায় তাকে ‘ডান্ডাবেড়ি’ ও হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় হাজির করা হয়।

জানাজার মাঠে কান্নার রোল ও লোহার শব্দ
সুবিদপুর ইউনিয়নের সেই ছাত্রলীগ নেতা দীর্ঘদিন ধরে কোনো সুনির্দিষ্ট দণ্ড ছাড়াই কারাগারে বন্দি ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে তিনি প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য মুক্তি মিললেও তার পায়ে পরানো হয়েছিল ভারী লোহার শিকল। যখন তিনি তার বাবার লাশের সামনে জানাজা পড়তে দাঁড়ান, তখন লোহার শিকলের ঝনঝনানি শোকের পরিবেশকে আরও ভারী করে তোলে। উপস্থিত মুসল্লিরা জানান, একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান ও যন্ত্রণা আর কিছুই হতে পারে না।
অপরাধী বনাম রাজনৈতিক কর্মী: আইনি প্রয়োগের বৈষম্য?
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে ডান্ডাবেড়ি পরানোর বিষয়টি কেবল তখনই খাটে যখন কোনো বন্দি অত্যন্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বা জেল ভেঙে পালানোর ঝুঁকি থাকে। একজন ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীকে বাবার জানাজায় এভাবে শিকল পরিয়ে আনা কি একান্তই প্রয়োজনীয় ছিল?
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন—
“রাজনীতিতে মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু মানবিকতা কি কোনো দলের হয়? বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানের চোখের জল কি লোহার শিকলে ঢাকা সম্ভব?”
১৮ মাসের বন্দি জীবন ও বিনা বিচারে আটক
অভিযোগ উঠেছে, এই ছাত্রনেতা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্দিষ্ট মামলা বা রায় ছাড়াই কারাবরণ করছেন।
৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রেই ‘গণহারে মামলা’ ও ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ হিসেবে ধরপাকড় করা হচ্ছে।
সুবিদপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মীদের মৌলিক অধিকার এবং ব্যক্তিগত শোক প্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে রায় দিয়েছেন যে, জানাজা বা শেষকৃত্যের সময় প্যারোলে মুক্ত বন্দিদের ডান্ডাবেড়ি পরানো উচিত নয়, যদি না বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগের একটি মাধ্যম হিসেবে ডান্ডাবেড়ি বা লোহার শিকল ব্যবহার করা হয়।
তারা স্পষ্টভাবে বলেছে, বন্দিদের সাথে আচরণে ন্যূনতম মানবিকতা বজায় রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
জানাজার মতো একটি ধর্মীয় ও আবেগময় মুহূর্তে শিকল পরানো সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সমাজের বিবেক ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতা
রাজনীতি আজ আমাদের এতটাই বিভক্ত করে ফেলেছে যে, আমরা ভুলে গেছি প্রতিপক্ষও একজন রক্ত-মাংসের মানুষ।
যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শোকের মুহূর্তে ন্যূনতম সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের অধীনে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার যে কথা বলা হচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে এমন অমানবিক দৃশ্য সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে
জনরোষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
ফেসবুক ও এক্স-এ (সাবেক টুইটার) মানুষ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
অনেকেই বলছেন, ছাত্রলীগের প্রতি ঘৃণা থাকতে পারে, কিন্তু বাবার জানাজায় আসা সন্তানের প্রতি অমানবিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রতিহিংসামূলক আচরণ সমাজকে আরও বেশি অসহিষ্ণু করে তুলবে।
মানবিকতার জয় হোক
রাজনীতি থাকবে, সরকার বদলাবে, কিন্তু মানবিকতা যেন চিরস্থায়ী হয়।
সুবিদপুরের সেই ছাত্রলীগ নেতার পায়ের শিকড় কেবল তার ব্যক্তিগত অবমাননা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় বিচারিক পদ্ধতির একটি ক্ষত।
শোকের ওপর এই শিকলের আঘাত শেষ পর্যন্ত কোনো সুফল বয়ে আনে না।
রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত এমন পরিস্থিতি পরিহার করা, যেখানে একটি সন্তানের চোখের জল লোহার বেড়ি দিয়ে আড়াল করা হয়।
আমরা আশা করি, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে প্রতিহিংসামুক্ত এবং মানবিক
