কানাডার ওন্টারিও আর্টস ফাউন্ডেশন থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রোটেজে অ্যাওয়ার্ড’ জয় করলেন তানভীর আলম। কিংবদন্তি লতা পাদার হাত ধরে এই বিশেষ সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন।
প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির জয়গান গেয়ে চলেছেন তরুণ তুর্কিরা। সেই ধারায় এবার যুক্ত হলো এক নতুন পালক। কানাডার ওন্টারিও আর্টস ফাউন্ডেশন (Ontario Arts Foundation) প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘এলড্রেড ফ্যামিলি ড্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ (Eldred Family Dance Award)-এর অধীনে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ‘প্রোটেজে অ্যাওয়ার্ড’ (Protégé Award) জয় করেছেন টরন্টো-ভিত্তিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার তানভীর আলম। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যই পাননি, বরং বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ এশীয় তথা বাংলাদেশি নৃত্যের ধারাকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে গেছেন।
কিংবদন্তি লতা পাদার নির্বাচন: এক অনন্য স্বীকৃতি
তানভীর আলমের এই অর্জনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো তার নির্বাচক। দক্ষিণ এশীয় নৃত্যের বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব এবং কানাডায় ভরতনাট্যম নৃত্যের পথিকৃৎ লতা পাদা (Lata Pada) ব্যক্তিগতভাবে তানভীরকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন।
লতা পাদা কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি কানাডার ‘সম্প্রদায় ড্যান্স ক্রিয়েশনস’ (SAMPRADAYA Dance Creations)-এর প্রতিষ্ঠাতা।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে শাস্ত্রীয় নৃত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এমন একজন মহীরুহ শিল্পীর হাত ধরে ‘প্রোটেজে’ বা উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া যেকোনো উদীয়মান শিল্পীর জন্য এক দুর্লভ সম্মান।
১০ হাজার ডলারের সম্মাননা ও উত্তরাধিকারের আলোকবর্তিকা
এই পুরস্কারের সাথে তানভীর আলম ১০,০০০ (দশ হাজার) ডলারের আর্থিক সম্মাননা লাভ করেছেন।
তবে শিল্পবোদ্ধাদের মতে, এই অর্জনের মূল্য কেবল অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে শিল্পের আলোকবর্তিকা হস্তান্তরের প্রতীক। লতা পাদার মতো একজন গুরু যখন একজন তরুণ শিল্পীর ওপর আস্থা রাখেন, তখন সেটি সেই শিল্পীর সৃজনশীলতা ও সাধনার চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়।
কত্থক ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে তানভীরের যাত্রা
তানভীর আলম মূলত কত্থক এবং সমসাময়িক নৃত্যের ওপর ভিত্তি করে তার শৈল্পিক সত্তা গড়ে তুলেছেন।
দীর্ঘদিনের নিরলস সাধনা, সংগ্রাম এবং প্রথাগত নৃত্যের বাইরে নতুন কিছু করার সৃজনশীল আকাঙ্ক্ষাই তাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
তার কাজগুলো ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে নৃত্যের একটি বৈশ্বিক ভাষা তৈরি করেছে।
কানাডার মূলধারার শিল্পমঞ্চে তার এই অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশীয় নৃত্যের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গুরুর আশীর্বাদ ও আবেগের স্বীকৃতি
একজন গুরুর হাত ধরে যখন কোনো শিষ্য সাফল্যের শিখরে পৌঁছান, তখন সেটি কেবল একটি পুরস্কার থাকে না, বরং তা গভীর আবেগের এক স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়ায়। তানভীর আলমের এই অর্জন উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের এক অপূর্ব মিলন ঘটিয়েছে।
লতা পাদা যেভাবে তার চার দশকের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই পথটি প্রশস্ত করেছেন, তানভীর সেই পথে নতুনের কেতন উড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
প্রবাসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সাফল্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডাসহ ইউরোপ-আমেরিকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির দুনিয়ায় ইউটিউবের উদ্ভাবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক শিল্পকলা—সবখানেই বাংলাদেশিদের পদচারণা বাড়ছে।
তানভীর আলমের এই পুরস্কার প্রাপ্তি সেই সাফল্যেরই একটি ধারাবাহিকতা, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের সংবাদ।
আগামীর সম্ভাবনা: বিশ্বমঞ্চে দক্ষিণ এশীয় নৃত্য
তানভীর আলমের এই জয় দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ওন্টারিও আর্টস ফাউন্ডেশনের মতো বড় সংস্থাগুলো এখন শাস্ত্রীয় নৃত্যের আধুনিক সংস্করণকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
এটি ভবিষ্যতে আরও অনেক বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় তরুণ শিল্পীকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াই করার প্রেরণা যোগাবে।
সাফল্যের নতুন দিগন্ত
তানভীর আলম কেবল একটি পুরস্কার পাননি, তিনি পেয়েছেন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করার দায়িত্ব।
কিংবদন্তি লতা পাদার আশীর্বাদ নিয়ে তিনি যেভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
এই ১০ হাজার ডলারের সম্মাননা তার শিল্পীজীবনের এক বড় প্রাপ্তি হতে পারে, তবে তার আসল অর্জন হলো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা।
সকল বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে তানভীর আলমকে অভিনন্দন ও লাল সালাম।
