ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় ৮৫০টি মশার কামড়—গবেষণায় উঠে এল ভয়াবহ তথ্য। দেড় বছর ধরে অভিভাবকহীন সিটি করপোরেশন ও বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
রাজধানী ঢাকা এখন মশার অভয়ারণ্য। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিষিয়ে উঠেছে ক্ষুদ্র এই পতঙ্গের যন্ত্রণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাসারের গবেষণা দলের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য—ঢাকায় বর্তমানে একজন মানুষকে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৮৫০টি মশা কামড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, ঘণ্টায় মাত্র ৫টি মশার কামড়কেই ‘অসহনীয়’ ধরা হয়, সেখানে ঢাকার পরিস্থিতি ১৭০ গুণ বেশি ভয়াবহ। গত চার দশকে মশার এমন উপদ্রব এবং সরকারের এমন চরম উদাসীনতা আর কখনো দেখা যায়নি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী নগরবাসী।
গবেষণার ভয়াবহ পরিসংখ্যান: মশার কামড়ে অতিষ্ঠ জনজীবন
ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, মশার ঘনত্ব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, মার্চ মাসে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। অধ্যাপক কবিরুল বাসারের তথ্যমতে, মশা নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ না করায় কিউলেক্স মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই ৮৫০টি কামড় কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি মেগাসিটির জনস্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকির প্রতিফলন।
১২ ফেব্রুয়ারির ‘নাটক’ এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকট
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোসহ সাধারণ মানুষও ‘বর্জন’ করেছে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই নিজেরা নিজেরা মঞ্চ সাজিয়ে ক্ষমতায় বসা বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যে দলের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল গণতন্ত্রকে অবজ্ঞা করে, সেই বিএনপি সরকারের কাছে জনগণের ভোগান্তি লাঘব করা কখনোই অগ্রাধিকার ছিল না। এই তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ এখন কেবল ক্ষমতার সুফল ভোগ করতেই ব্যস্ত, নগর ব্যবস্থাপনায় তাদের কোনো নজর নেই।
অভিভাবকহীন সিটি করপোরেশন ও জবাবদিহিতার অভাব
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো নির্বাচিত মেয়র বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর নেই। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিধন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
- তদারকির অভাব: মশককর্মীরা মাঠে যাচ্ছে কি না বা কীটনাশক স্প্রে হচ্ছে কি না, তা দেখার কেউ নেই।
- অযোগ্য প্রশাসন: মন্ত্রিপরিষদের কাছে নগরবাসীর এই কষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে না।
- চেইন অফ কমান্ড নেই: কাউন্সিলর না থাকায় মশা নিধনের ফগার মেশিনগুলো এখন অকেজো পড়ে আছে, যা জনগণের করের টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
| সূচক | আন্তর্জাতিক মানদণ্ড | ঢাকার বর্তমান অবস্থা | মন্তব্য |
| ঘণ্টায় মশার কামড় | ৫টি (অসহনীয়) | ৮৫০টি | ১৭০ গুণ বেশি ভয়াবহ |
| সিটি প্রশাসন | নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি | দেড় বছর ধরে শূন্য | জবাবদিহিতা নেই |
| পারিবারিক খরচ | নগণ্য | প্রতি মাসে বাড়তি ২-৫ হাজার টাকা | বেঁচে থাকার লড়াই |
| ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া ঝুঁকি | নিয়ন্ত্রিত | চরম ঝুঁকি | মহামারি হওয়ার আশঙ্কা |
পকেট কাটছে সাধারণ মানুষের: ‘বেঁচে থাকার ট্যাক্স’
মশা নিধনের ব্যর্থতায় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বাড়তি টাকা চলে যাচ্ছে কয়েল, অ্যারোসল, অডোমস আর গুড নাইট লিকুইড কিনতে। যে মানুষটি নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছে, সে কেন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মশার কামড় সইবে? নগরবাসীরা ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের ট্যাক্সের টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে? বর্তমান সরকারের এই উদাসীনতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
গ্রাম ও শহরের একাকার দশা: ভোগান্তি এখন সর্বত্র
মশার এই উপদ্রব এখন আর কেবল ঢাকার গল্প নয়। এবার ঈদে যারা গ্রামে গেছেন, তারা দেখেছেন যে গ্রাম আর শহরের পরিস্থিতির কোনো ফারাক নেই। গত চার দশকে মশার এমন বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি এখন প্রতিটি দোরগোড়ায়। অথচ সরকার এই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় পুরোপুরি নির্বিকার।
বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা
অনেকেই মনে করেন, বিএনপির দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের কোনো জায়গা নেই। অতীতেও এই দলের শাসনামলে নাগরিক সুবিধার চরম বিপর্যয় দেখা গেছে। এবারও তারা ভোটের নাটক সাজিয়ে গদিতে বসলেও জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ৮৫০টি কামড়ের এই তথ্যটি কেবল কীটতত্ত্বের উপাত্ত নয়, এটি মূলত এই সরকারের প্রতি নাগরিকদের সম্পূর্ণ উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে ঢাকার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। বর্তমান সরকারের বৈধতাহীনতার কারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সঠিক কারিগরি পরামর্শের ক্ষেত্রেও বড় ধরণের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
অযোগ্যতার দণ্ড দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
ঢাকাবাসী আজ কেবল মশার কামড়ে নীল হচ্ছে না, বরং তারা এক অপদার্থ সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার দণ্ড দিচ্ছে।
প্রতি ঘণ্টায় ৮৫০টি কামড় মানে হলো প্রতিটি সেকেন্ডে নাগরিকদের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা। একটি মেগাসিটির মেয়র ও কাউন্সিলর পদ দেড় বছর শূন্য রাখা কোনো সুস্থ রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিচয় হতে পারে না। এই অরাজকতা আর কতদিন চলবে, সেই প্রশ্নই এখন প্রতিটি দগ্ধ নগরবাসীর। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পর এখন কি মশার কামড়ে তাদের জীবনও কেড়ে নেওয়া হবে?
