সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি ও ইউনুস আমলের অর্থনৈতিক লুন্ডন ও পাচার নিয়ে নতুন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তুঙ্গে।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ বা অর্থ পাচার দীর্ঘকাল ধরে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জাতীয়ভাবে আলোচিত বিষয়। বিগত ২০২৪ সালের এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছে। এই সময়কালকে কেন্দ্র করে সমসাময়িক রাজনীতি এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলে নতুন নতুন বিতর্ক ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনা সামনে আসছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (SNB) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে একটি বড় ধরণের ঝাঁকুনি দেখা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ এক ধাক্কায় প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গাণিতিক লাফ অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময়ে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা এবং অর্থ পাচার রোধে নেওয়া বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন: আমানতের উল্লম্ফন ও পরিসংখ্যান
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সাম্প্রতিক বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েছে।
আমানতের পরিমাণ: ২০২৪ সালে যা ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, তা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে।
টাকায় রূপান্তর: বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজার দর অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁ প্রায় ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকা হিসাব করলে,
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২,৬৭৮ কোটি টাকা।
ঐতিহাসিক তুলনা: পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত সর্বোচ্চ ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছিল।
এরপর দুই বছর তা কমলেও, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে তা পুনরায় বড় ধরণের উল্লম্ফন প্রত্যক্ষ করল,
যা গত ১০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

ভূ-সামুদ্রিক ও আন্তর্জাতিক পাচার রুট: ১০ দেশের প্রভাব
অর্থনৈতিক গবেষক এবং গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী,
সুইস ব্যাংক মূলত বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করে।
বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ মূলধন অবৈধভাবে বাইরে চলে যায়, তার সিংহভাগই স্থানান্তরিত হয় বিশ্বের অন্য ১০টি প্রধান গন্তব্যে।
বাংলাদেশি অর্থ পাচারের প্রধান ১০টি গন্তব্য:
├── ১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) ├── ৫. সিঙ্গাপুর (Singapore) ├── ৯. কেম্যান আইল্যান্ডস
├── ২. যুক্তরাজ্য (UK) ├── ৬. হংকং (Hongkong) └── ১০. ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস
├── ৩. কানাডা (Canada) ├── ৭. সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)
└── ৪. অস্ট্রেলিয়া (Australia) └── ৮. মালয়েশিয়া (Malaysia)
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুইস ব্যাংকে যে পরিমাণ আমানত বৃদ্ধি পায়, তার সমান্তরালে বা তার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি অর্থ এই প্রধান ১০টি দেশে বা ট্যাক্স হ্যাভেনে (Tax Haven) পাচার হয়ে থাকে।
এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছেন যে,
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশ থেকে বিপুল অংকের মূলধন বাইরে চলে গেছে, যা অতীতের অনেক রেকর্ডকে স্পর্শ করেছে।
বিগত আমলের শ্বেতপত্র বনাম বর্তমানের তুলনা
অর্থ পাচারের এই বিতর্কটি বর্তমান নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহার এবং বক্তব্যের কারণে আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত ‘অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র তথ্যানুযায়ী,
২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার,
যা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমান।
বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তাঁর একাধিক ভাষণে এবং জাতীয় সংসদে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, দেশের সম্পদ আর কোনোভাবেই বাইরে পাচার হতে দেওয়া হবে না। এবারের জাতীয় বাজেটেও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ আইনি ও কূটনৈতিক সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বর্তমান সরকারের সমর্থকরা সুইস ব্যাংকের এই নতুন তথ্যকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন আমলের উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করছেন।
তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থ পাচার রোধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে,
খুব দ্রুত বা ছয় মাসের মধ্যে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনা হবে।
তবে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তৎকালীন বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে নানামুখী দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যান্য প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো এখন রাজনৈতিক মহলে ওপেন সিক্রেট। এমনকি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন আমলের কিছু মহলের আর্থিক অনৈতিকতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
সমালোচকদের দাবি, প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের আড়াল করে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের নামকরা বেসরকারি শিল্প গ্রুপ ও বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এক ধরণের ঢালাও ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক বেসরকারি বিনিয়োগে এক ধরণের স্থবিরতা ও ভয়ভীতি তৈরি হয়,
যার সুযোগ নিয়ে প্রকৃত অপরাধীরা গোপনে নতুন করে অর্থ পাচারের পথ খুঁজে পায়।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি: দলমত নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিতের তাগিদ
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এবং নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একমাত্র দাবি হলো
—দেশের কষ্টার্জিত অর্থ যারা বাইরে পাচার করেছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা।
বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ আমল, পরবর্তী দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন আমল, কিংবা বর্তমান প্রশাসনের সাথে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা যদি বিএনপিরও কোনো নেতাকর্মী এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকেন, তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সমভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত:
অর্থ পাচারকারী এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা আদর্শ নেই।
তাদের একমাত্র পরিচয় তারা দেশের অর্থনীতি এবং জনগণের শত্রু।
যদি বিগত দেড় দশকের পাচার হওয়া অর্থ আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই ও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স চুক্তির মাধ্যমে ফেরত আনতে সক্ষম হয়,
তবে দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট কেটে যাবে এবং অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষায় বর্তমান প্রশাসন
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির এই চিত্র বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য যেমন একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র, ঠিক তেমনি একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হওয়া সমস্ত আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং অর্থ পাচারের অভিযোগগুলোর একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
জনগণের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার কোনো রাজনৈতিক বাছবিচার না করে, অতীতে পাচার হওয়া অর্থের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যারা দেশের মূলধন বাইরে পাচার করেছে, তাদের সবাইকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
কেবল মুখের কথায় নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই দেশের আর্থিক খাতে প্রকৃত সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
